Archive for August, 2011

August 19th, 2011

ছিন্নমূলদের ঘর-বসতি

পথেই ওদের জন্ম, বেড়ে উঠা। থাকা-খাওয়া, বিয়ে-সংসার সবই হচ্ছে ফুটপাতে। কাগজ টুকিয়ে, রিকশা-ভ্যান চালিয়ে, হোটেল বা বাসাবাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে ওরা। বছরের পর বছর ধরে চলছে কয়েক হাজার ছিন্নমূল মানুষের এই কায়দায় বসবাস। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম ও মাওলানা ভাসানি জাতীয় হকি স্টেডিয়ামের বারান্দা-ফুটপাতই তাদের ঘর-দুয়ার। দারিদ্র্য, নদী ভাঙ্গন, পিতা-মাতার বিবাহ বিচ্ছেদ, বহু বিবাহ, অকাল মৃত্যু, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনসহ নানা কারণে এ সব মানুষ পথে আসতে বাধ্য হয়েছে। বৃত্তাকার দুই স্টেডিয়ামের বারান্দা ও রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে নারী-পুরুষ রাত যাপন করার দৃশ্য দেখলে মনে হয়, এটা যেন এক ভিন্ন জগত্, ভিন্ন সমাজ।

গত বুধবার রাত ১১টায় ইত্তেফাকের আলোকচিত্র সাংবাদিক সাইফুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে এই প্রতিনিধি বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম ও মাওলানা ভাসানি জাতীয় হকি স্টেডিয়ামের বারান্দা ও ফুটপাতে সরেজমিনে গিয়ে দেখতে পান শিশু থেকে বয়স্ক পর্যন্ত অসংখ্য মানুষ সারিবদ্ধভাবে ঘুমাচ্ছে। কেউ কেউ বসে জীবনের সুখ-দুঃখের গল্প করছে। তবে এরা শুধু রাত ১১টা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত স্টেডিয়ামের বারান্দা ও ফুটপাতে ঘুমাতে পারে। সূর্য উঠার পর কাউকে ফুটপাতে দেখা যায় না। তাদের এই নির্ধারিত সময় বেধে দিয়েছে স্টেডিয়াম এলাকার দোকান মালিক এবং নাইট গার্ডগণ। নাইট গার্ডরা তাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করে থাকে। মানুষ মানুষের জন্য এই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন স্টেডিয়াম দোকান মালিকগণ। তারা প্রতিটি দোকানের সামনে এই অসহায় মানুষদের ফুটপাত ও রাস্তায় ঘুমাতে সুযোগ দিয়েছেন।

নিরীহ নারী-পুরুষরা জানান, দোকান মালিকরা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত আমাদের ঘুমাতে দেন। স্টেডিয়ামে রাত যাপনে ক্রীড়া পরিষদও এই অসহায় লোকদের প্রতি অনুরূপ মহানুভবতা দেখাচ্ছে। এসব বিত্তহীন মানুষের পক্ষে ঘর ভাড়া দিয়ে থাকা সম্ভব নয়। সারাদিন দিনমজুরের কাজ কিংবা অনেকে ভিক্ষা করে জীবিকার সন্ধানে ব্যস্ত থাকে। সারাদিনে কেউ একশত থেকে তিনশত টাকা পর্যন্ত আয় করে থাকে। এই টাকা বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে দুই বেলা খাবারে ব্যয় হয়। এরপর স্ত্রী সন্তানের কাপড় চোপড় ক্রয় করতে হয়। সারাদিনের পরিশ্রমের ফসল সামান্য আয় দিয়ে শুধু ফুটপাতেই একজন কোনরকমে টিকে থাকতে পারে। পরিবারের সদস্যদের কিংবা স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে এই সামান্য কয় টাকা দিয়ে বেঁচে থাকা খুবই কষ্টদায়ক।

শিশু, কিশোরসহ নারী-পুরুষের সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেন, তাদের কারো কারো জন্ম এই স্টেডিয়ামের বারান্দায়, কারো বিয়ে হয়েছে এখানে, কেউ ২০ থেকে ৩০ বছর যাবত্ এখানেই রাত কাটায়। তাদের জীবনে চরম দুর্বিষহ অবস্থার কথা বলতে বলতে অনেকে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। সূর্য উঠার সঙ্গে সঙ্গে কাজের সন্ধানে তারা ছুটে যায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়। রাত ১০টা বাজলে ঘুমানোর জন্য ছুটে আসে স্টেডিয়ামের বারান্দার ফুটপাতে। মাত্র একটি গামছা, লুঙ্গি ও পলিথিন হলো তাদের বিছানা। বালিশ হিসাবে ছেঁড়া, টুকরা কাপড় পোঁটলা করে মাথার নিচে দিয়ে রাত কাটায়। কোন মশারি নেই। ঘুমন্ত শিশু, নারী ও পুরুষদের হাতে-পায়ে মশা কামড়াতে দেখা যায়। ঠিকমত তাদের গোসল করা সম্ভব হয় না। পাবলিক টয়লেটে প্রতিজন গোসল করতে ১০ টাকা ও মলমূত্র ত্যাগে পাঁচ টাকা ব্যয় হয়। এ কারণে অনেকে দুই থেকে তিন দিন পর গোসল করে থাকে। অনেক সময় মলমূত্র পাশের ড্রেন ও বঙ্গভবন পার্কে সেরে নেয় বলে অনেকে জানায়। শিশু সন্তানদের গোসল করানো সম্ভব হয় না। পিতামাতা গোসল শেষে সেই ভেজা কাপড় দিয়ে শিশু সন্তানদের দেহ মুছে দেন। এটাই সপ্তাহে একবার শিশু সন্তানদের গোসল। রাস্তাঘাটে ও ফুটপাতে নিম্নমানের ও নোংরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি স্বল্পমূল্যের খাবার খেয়ে বছরের পর বছর তারা কাটাচ্ছে। শিশু সন্তানগুলো নানা রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত। নারী-পুরুষদের মধ্যে শারীরিক অসুস্থতা লেগেই আছে। এ কারণে একজন কাজ করে পরিবারের অন্যরা বসে খায়। এমন ঘটনাও সেখানে নিত্যদিন ঘটছে। স্টেডিয়ামের আসরে অনেক দিনমজুর ও খেটে খাওয়া তরুণ-তরুণীর মধ্যে প্রেম হয়। পরে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। স্টেডিয়াম এলাকার দোকানপাটের মালামাল আনা-নেয়ার ভ্যানচালক ও শ্রমিকদের ৯০ ভাগ সেখানে থাকে। তবে তারা স্টেডিয়ামের মার্কেটের দোতলায় বারান্দায় রাতযাপন করে। নাইট গার্ড, দোকান মালিক ও কর্মচারীদের মতে, দুই স্টেডিয়ামের বারান্দা ও রাস্তায় প্রতি রাতে প্রায় ৩ হাজার ছিন্নমূল মানুষ রাত কাটায়।

সোহেল (২২) নামের এক তরুণ ভাঙা লোহা-লক্কড় টোকাইয়ের কাজ করে সারাদিন। সন্ধ্যায় পুরানা ঢাকায় এগুলো বিক্রি করে এক থেকে ৩শ’ টাকা পকেটে নিয়ে স্টেডিয়ামে ফিরে। প্রায় ১০ বছর স্টেডিয়ামে রাত কাটিয়ে আসছে। শিশু বয়সে তার বাবা মারা যায়। মা জায়েদা আক্তার ময়মনসিংহে খালার বাসায় অবস্থান করছে। তারা দুই ভাই। পরিবারের কারো সঙ্গে তার যোগাযোগ নেই। একটি গামছা বিছিয়ে সোহেল ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সাংবাদিক পরিচয় শুনে জীবনের দুঃখ-দুর্দশার কাহিনী তুলে ধরে। তার জন্ম বাড্ডা এলাকায় বলে সোহেল জানায়।

টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর এলাকার রিকশাচালক আব্দুর রফিকের ছেলে মাহরুফ (১৮) ছোট বেলা থেকে স্টেডিয়ামে থাকে। তার বাম পা ৫ বছর পূর্বে এক দুর্ঘটনায় কেটে ফেলা হয়। এরপর সে গুলিস্তান এলাকায় ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করে। আগে মাহরুফ টোকাইয়ের কাজ করতো। মাথায় একটি ইট দিয়ে ধুলাবালির মধ্যে স্টেডিয়ামের ফুটপাতে ঘুমায়। তার কোন বিছানাও নেই। ৩ ভাই ও দুই বোন। মাহরুফের সঙ্গে হয়তো বছরে তাদের সঙ্গে একবার দেখা হয়।

ময়মনসিংহ হালুয়াঘাট এলাকার মৃত হোসেল আলীর ছেলে আব্দুল আজিজ (২৫) ১৫ বছর স্টেডিয়ামে থাকছে। সে গুলিস্তান ফুটপাতে ভাঙা মোবাইল ফোনের পুরাতন যন্ত্রাংশ বিক্রি করে। পুলিশকে নিয়মিত চাঁদা না দেয়ায় তাকে ছিনতাইকারী বলে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। ৪ বছর জেল খাটার পর ৪ মাস আগে সে ছাড়া পায়। ২ ভাই ও এক বোন এবং মায়ের সঙ্গে বহু বছর ধরে দেখা হয় না। এখন কে, কোথায় আছে, তাও তার জানা নেই।

শাহনুর বেগম (৩৫), বাড়ি ভোলা জেলার ভেলুমার চর গ্রামে। হতদরিদ্র পরিবারে তার জন্ম। ১৫ বছর আগে বাঁচার তাগিদে লঞ্চযোগে ঢাকা চলে আসে। স্টেডিয়ামে এসে আশ্রয় নেয়। স্টেডিয়াম এলাকায় দিনমজুর হোসেন আলীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তার ছয় মেয়ে ও এক ছেলে। পুরনো জিনিসপত্র ও কাগজ টুকিয়ে তাদের বাঁচার সংগ্রাম নিত্যদিন। তবে এ অবস্থায়ও তারা ভাল আছেন বলে জানান।

বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার সোবহানপুর গ্রামের বাসিন্দা অতিদরিদ্র রফিকুল ইসলাম (৪৫) এক কাপড়ে বাঁচার জন্য ঢাকায় চলে আসে ১০ বছর আগে। স্টেডিয়ামে রাত কাটান। দিনে রাজধানীর রাস্তার মোড়ে মোড়ে ভিক্ষা করেন। তার বাম হাত নেই। গ্রামে দুই মেয়ে ও স্ত্রী আছে। আয়ের কিছু অংশ প্রতি মাসে পরিবারের জন্য পাঠান। এই দিয়ে স্ত্রী ও কন্যার কোন রকমে অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটছে। বেশ কয়েক বছর স্ত্রী- মেয়েদের সঙ্গে দেখা হয় না। মাঝে মধ্যে ফোনে কথা হয় বলে তিনি জানান।

বরিশাল কোতোয়ালি রুহাইয়া এলাকার দরিদ্র পরিবারের জন্ম নেয় কমলা বেগম (২৮) ১২ বছর আগে ঢাকায় চলে আসে। ছয় বছর আগে রিকশাচালক সিদ্দিকের সঙ্গে তাদের বিয়ে হয় স্টেডিয়াম এলাকায়। দুই মেয়ে ও এক শিশু ছেলে তাদের। স্বামী তিন মাস ধরে অসুস্থ। কোন কাজ করতে পারে না। কমলা ভিক্ষা করে কিংবা হোটেলে কাজ করে স্বামী ও সন্তানদের দু’মুঠো খাবার যোগান দিয়ে যাচ্ছে। স্টেডিয়ামে ছেঁড়া কাপড় বিছিয়ে স্বামী সন্তান নিয়ে রাত কাটায়।

সুব্রত কুমার ভৌমিক (৪০) স্টেডিয়ামে বেশ কয়েক বছর যাবত্ রাত কাটান। নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলায় তার বাড়ি। সুশিক্ষিত সুব্রত কুমার কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী। ১২ বছর আগে মুন্সিগঞ্জ শ্রীনগর উপজেলায় মুসলিম পরিবারের হালিমা আক্তার নামে এক তরুণীকে বিয়ে করে। পরে মুসলমান হয়ে যান। তার নাম রাখা হয় ইকবাল হোসেন শুভ। এই নিয়ে পিতা-মাতার সঙ্গে তার সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটে। বিয়ের কয়েক বছর পর তাদের মধ্যে দাম্পত্য বিরোধ বাধে। ঘটে বিচ্ছেদ। শুভর একটি শিশু সন্তান রয়েছে। তার নাম ইশাদ বলে শুভ জানান। দৈনিক তার ২০ টাকা হলে দিন কেটে যায়। নিরীহ দরিদ্র লোকের সঙ্গে তার থাকতে খুবই ভাল লাগে বলে জানান। মানসিক রোগে ভুগছেন শুভ।

ফরিদপুর ভাঙ্গা উপজেলার শাহ আলম (৪৫) ১৫ বছর যাবত্ স্টেডিয়াম এলাকায় থাকছে। নদীগর্ভে সব কিছুই বিলীন হয়ে যায় তার। বাঁচার তাগিদে সে ঢাকায় চলে আসে। পিতা-মাতা, ভাই বোন কোথায় তাও সে জানে না। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দিনমজুরের কাজ করে শাহ আলম। রাত কাটায় স্টেডিয়াম এলাকায়।

ময়মনসিংহ গৌরীপুর এলাকার হাসনা বেগম (৪৭) ১৪ বছর ধরে স্টেডিয়াম এলাকায় রাত কাটান। আগে গ্রামে জজ পাগলার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। ষড়যন্ত্র করে তাকে মেরে ফেলা হয়। এরপর হাসনা ঢাকায় চলে আসে। ৫ বছর আগে স্টেডিয়াম এলাকায় ভারতীয় নাগরিক জাহাঙ্গীরের সঙ্গে পরিচয় হয়। পরে তার সঙ্গে পল্টন কাজী অফিসে ৫০ হাজার টাকা দেনমোহরে বিয়ে হয়। এরপর তারা ভাড়া বাসায় দুই বছর বসবাস করে। তিন বছর যাবত্ স্বামী ভারতে চলে যাওয়ায় পুনরায় হাসনা স্টেডিয়ামে এসে আশ্রয় নেয়। তবে স্বামী হাসনার জন্য টাকা পাঠায়। সে টাকায় তিন বেলা খাবার খায় এবং রাত কাটায় স্টেডিয়ামে। দেড় বছরের একটি সন্তান রয়েছে। স্টেডিয়ামে থাকা তার জন্য নিরাপদ বলে হাসনা জানান।

হবিগঞ্জ জেলার বামইর এলাকার জামালউদ্দিন (৪৭) ১০ বছর ধরে স্টেডিয়ামে রাত যাপন করছে। সে দিনে পুরনো ঢাকায় ডেকোরেটরের কাজ করে। এই স্বল্প বেতনে বাসা ভাড়া দিয়ে থাকলে পরিবারের সদস্যরা না খেয়ে থাকবে। এ কারণে বিনা ভাড়ায় রাত কাটায় স্টেডিয়াম এলাকায়। ঐ টাকা বাড়িতে প্রতি মাসে পাঠিয়ে থাকে বলে জামালউদ্দিন জানান।

বরিশাল মুলাদি উপজেলার তরুণী পারভীন (২০) ছোট বেলায় ঢাকায় চলে আসে। স্টেডিয়াম এলাকায় টোকাইর কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। দুই বছর আগে স্টেডিয়ামে বসবাসরত রিকশা চালক সাইদুলের সঙ্গে পারভীনের বিয়ে হয়। স্বামী-স্ত্রী স্টেডিয়ামে রাত যাপন করে।

জামালপুরের ওমর হোসেন (১০), নীলফামারী জেলার সৈয়দপুরের শরীফুল (১৪) ও কিশোরগঞ্জের শহীদ (১০)সহ ১০ জন শিশু দুই পঙ্গু ব্যক্তির ঠেলাগাড়ি চালক ও হেলপার হিসাবে তিন বছর যাবত্ চাকরি করে আসছে। দুই পঙ্গু ভিক্ষা করে গুলিস্তান ও হাইকোর্ট এলাকায়। একজন পঙ্গু ভিক্ষুকের পিছনে পাঁচ শিশু কাজ করে। প্রতি শিশুর মাসিক বেতন এক হাজার টাকা ও খাওয়া পঙ্গু ভিক্ষকের উপর। এরা রাত কাটায় স্টেডিয়াম এলাকায়। এইভাবে চলছে তাদের জীবন।

ছিন্নমূল এইসব নারী-পুরুষ জানায়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কাজ শেষে রাতে তারা ছুটে আসে স্টেডিয়ামে। এখানে না আসলে তাদের ভাল লাগে না। এখানে বসবাসকারীরা একে অপরের দুঃখের সাথী। অসুস্থ হলে অন্যরা হাসপাতালে নিয়ে যায়। নানা সেবা যত্ন করে। যা তারা কোনদিন পরিবারের সদস্যদের থেকে পায়নি। স্টেডিয়াম এলাকার রাস্তা ও ফুটপাতে তাদের জীবনের সুখ-দুঃখের স্মৃতিগাঁথা।

August 19th, 2011

অবৈধ অভিবাসীদের প্রতি ওবামা প্রশাসনের অনুকম্পা

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অবৈধ অভিবাসীদের ঢালাও বিতাড়নের প্রক্রিয়া বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এরই মধ্যে যাদেরকে বিতাড়নের আদেশ দেওয়া হয়েছে তাদের আবেদনও পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। কাজেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত বিতাড়নের আদেশ পাওয়া ব্যক্তিরা যুক্তরাষ্ট্রে থাকতে পারবেন। গতকাল বৃহস্পতিবার ওবামা প্রশাসন এ নির্দেশে দিয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের নাটকীয় এ নির্দেশে বিতাড়নের আদেশ পাওয়া তিন লক্ষাধিক অবৈধ অভিবাসীর মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। প্রকৃত পরিসংখ্যান না থাকলেও এর মধ্যে প্রচুর বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসীও আছেন, যাঁরা বৈধ হওয়ার সুযোগ পাবেন।
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান জেনেথ নেপোলিটেনো গতকাল কংগ্রেস সদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া এক পত্রে ওবামা প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। অবৈধ অভিবাসীদের মধ্যে নানা কারণে যাঁরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিতাড়নের আদেশ পেয়েছেন, তাঁদের বিষয়ে এ পরিপত্রে প্রশাসনিক অনুকম্পার কথা বলা হয়।
এ নির্দেশের প্রতিক্রিয়ায় রক্ষণশীলেরা তাত্ক্ষণিকভাবে বলেছে, কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে ‘পেছনের দরজা’ দিয়ে প্রশাসনিক দায়মুক্তি দেওয়া হচ্ছে।
ওই পরিপত্রে বলা হয়, বিতাড়ন আদেশপ্রাপ্তদের পুনর্বিবেচনার আবেদন প্রতিটি পৃথকভাবে বিবেচনা করা হবে। এ জন্য অভিবাসন আদালতগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পুনর্বিবেচনার সময় ছাত্র, পেশাজীবী, সাবেক মার্কিন সেনাসদস্য, বয়স্ক লোকজন, ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়া লোকজন এবং যুক্তরাষ্ট্রে পারিবারিক বন্ধন সৃষ্টি হয়েছে এমন আবেদনকারীদের বৈধতা দেওয়া হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়া অবৈধ অভিবাসীদের বিতাড়ন প্রক্রিয়া বন্ধ হবে না।
নেপোলিটেনো বলেছেন, বিতাড়ন আদেশপ্রাপ্তদের পেছনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাও বৃদ্ধি পাবে। তবে বিতাড়ন আদেশপ্রাপ্তদের প্রতি প্রশাসনিক এ অনুকম্পা অভিবাসন আইন সংস্কারের বিকল্প নয় বলে তিনি জানান।
এ সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রায় দুই কোটি অবৈধ অভিবাসীর অভিবাসন সমস্যার সমাধান হবে না। সমন্বিত অভিবাসন আইন সংস্কারের মধ্য দিয়েই অবৈধ অভিবাসীদের সমস্যার সমাধান করা হবে বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও গত এক দশকে প্রায় ছয় দফা উদ্যোগের পরও মার্কিন আইনপ্রণেতারা অভিবাসন আইন সংস্কারে ব্যর্থ হয়েছেন।
টেক্সাস থেকে নির্বাচিত রিপাবলিকান দলের কংগ্রেসম্যান মাইকেল ম্যাককুয়েল এক তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, কংগ্রেস এবং মার্কিন জনগণের ইচ্ছাকে পাশ কাটিয়ে ওবামা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিবাসন সংস্কার চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

August 18th, 2011

একই দিনে বিশ্বের ২৫টি দেশে মুক্তি পাবে ‘লালটিপ’

স্বপন আহমেদ পরিচালিত প্রথম ছবি ‘লালটিপ’। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসেও এটিই প্রথম ছবি, যা একই দিনে বিশ্বের ২৫টি দেশে মুক্তি পাবে। ছবিটি যৌথভাবে প্রযোজনা করছে ফ্রান্স ও বাংলাদেশ। এতে আমাদের দেশের শিল্পীরা যেমন অভিনয় করেছেন, তেমনি আছেন ফ্রান্সের শিল্পীরাও। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্যারিস, থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশের বিভিন্ন লোকেশনে এর শুটিং করা হয়েছে।
ছবিটির অধিকাংশ শুটিং হয়েছে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে। এতে ফ্রান্সের কয়েকজন জনপ্রিয় শিল্পীও অভিনয় করেন। বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছবিটি প্রদর্শনের জন্য ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশের পরিবেশকরা যুক্ত হয়েছেন ছবিটির সঙ্গে। এটি নির্মাণের জন্য অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সব সহযোগিতা করছে ফ্রান্স। বলা যায়, এ ছবিটি দিয়েই আন-র্জাতিক বাজারে এই প্রথম প্রবেশ করছে বাংলাদেশ। এজন্যই বলা হচ্ছে ‘লালটিপ’ই বাংলাদেশের প্রথম আন-র্জাতিক চলচ্চিত্র। এ ছবির কাহিনী গড়ে উঠেছে দুই প্রবাসী বাঙালিকে ঘিরে। এর একজন প্রবাসী নারী এবং অন্যজন বাংলাদেশের ছেলে, যিনি চাকরিসূত্রে ফ্রান্সে যান। ছবিটির মধ্য দিয়ে পরিচালক প্রবাসী বাঙালি কমিউনিটির একটি মেয়ের দ্বৈতসত্তাকে সামনে আনতে চেয়েছেন।

August 17th, 2011

নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার করল বাপেক্স

নতুন গ্যাস ক্ষেত্র

আগামী বছরের মার্চ থেকে প্রতিদিন প্রায় দেড় কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হবে

নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার করল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন কোম্পানি (বাপেক্স)। নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জের শাহাজাদপুরের সুন্দলপুরে এই ক্ষেত্র আবিষ্কার হলো। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে যোগ হলো আরো একটি নতুন গ্যাস ক্ষেত্র। গতকাল সকাল সাড়ে আটটার দিকে এই ক্ষেত্র থেকে গ্যাস বের হওয়া শুরু হয়। প্রকৌশলীরা নিশ্চিত করেছেন কয়েক মাসের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে এই ক্ষেত্র থেকে গ্যাস তোলা সম্ভব হবে।

বুধবার পেট্রোসেন্টারে অনুষ্ঠিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কারের ঘোষণা দেন পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. হোসেন মনসুর। এ সময় পেট্রোবাংলার পরিচালক পিএসসি মো. ইমাদউদ্দিন, বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোর্তজা আহমদ ফারুক ও পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন নোয়াখালী প্রতিনিধি আলমগীর ইউসুফকে এই প্রকল্পের খনন অনুসন্ধান কর্মকর্তা মো. সহিদ উল্লাহ জানান, কূপটির তৃতীয় জোনে সকালের দিকে গ্যাসের প্রবাহের অধিক চাপ দেখে সেখানে আগুন দেয়া হয়। তবে আগামী দুইদিন কূপে গ্যাসের প্রবাহ রেকর্ড করে এ স্থানে কি পরিমাণ গ্যাস রয়েছে তা নিরূপণ করা সম্ভব হবে। এতে গ্যাস উত্তোলন করার পর কতটা লাভজনক হবে তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।

সুন্দলপুরের এই আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ১৫ বছর পর রাষ্ট্রীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কোম্পানি বাপেক্স নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কারের খবর দিল।

২০১২ সালের মার্চ মাস নাগাদ নতুন এ ক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন এক কোটি ২০ লাখ থেকে এক কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে। গ্যাস ক্ষেত্রটি নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জের শাহাজাদপুর এলাকায় অবস্থিত। প্রাথমিকভাবে স্থানীয় সঞ্চালন লাইনের সঙ্গে আট ইঞ্চি ব্যাসের ছয় কিলোমিটার পাইপ লাইন নির্মাণ করে সুন্দলপুর গ্যাস ক্ষেত্রকে জাতীয় গ্রীডে যুক্ত করা হবে। ফেনী এবং মাইজদী এলাকায় সুন্দলপুরের গ্যাস সরবরাহ করা হবে। জাতীয় গ্রিড থেকে ফেনী এবং মাইজদীর গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে ওই গ্যাস বন্দর নগরী চট্টগ্রামে সরবরাহ করা হতে পারে। এতে চট্টগ্রামের গ্যাস সংকট কিছুটা কমবে বলে মনে করছে পেট্রোবাংলা।

ভূপৃষ্ঠের এক হাজার ৩৯৯ থেকে এক হাজার ৪০৪ মিটার নিচে পাঁচ মিটার পুরুত্বজুড়ে এই গ্যাসের অবস্থান। পূরত্বের দিক দিয়ে কম হলেও গ্যাস ক্ষেত্রটি একই উপজেলার বেগমগঞ্জ গ্যাস ক্ষেত্র পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে এখান থেকে বেশ কয়েক বছর গ্যাস পাওয়া যাবে। ত্রিমাত্রিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ করে সুন্দলপুরে আরো উত্তোলন কূপ খনন করা হবে। তবে এখানে কি পরিমাণ গ্যাসের মজুদ রয়েছে তা নির্ধারণের জন্য আরো কয়েকদিন সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন সংশিষ্টরা।

সাংবাদিক সম্মেলনে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান বলেন, সুন্দলপুরে গ্যাস প্রাপ্তি গোটা জাতির জন্য সুখবর। গত ২১ ডিসেম্বর খনন শুরুর পর আরো আগেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিন হাজার ১৯১ থেকে তিন হাজার ২২১ মিটার এবং তিন হাজার ১১৮ থেকে তিন হাজার ২২১ মিটার গভীরতায় যে গ্যাস পাওয়া গিয়েছিল তা বাণ্যিজ্যিকভাবে উত্তোলন সফল হতো না। এছাড়া সিমেন্টিং করতে হয় এবং একবার পাইপ আটকে যায়। এতে গ্যাস উত্তোলন দেরী হয়। গ্যাস ক্ষেত্রটি বেশ বিস্তৃত বলে পরে ত্রিমাত্রিক জরিপ করে উত্পাদন কূপ খননের মাধ্যমে উত্তোলনের পরিমাণ বাড়ানো হবে।

সরকারের এই মেয়াদে শ্রিকাইল, কাপাসিয়া, মদন, মোবারকপুর, রাজউকের পূর্বাচল এবং রূপগঞ্জে অনুসন্ধান কূপ খনন করে নতুন নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কারের চেষ্টা করা হবে। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের তিনটি রিগ ছিল। বর্তমান সরকার এসেই আরো তিনটি নতুন রিগ কিনে দিয়েছে বাপেক্সকে। যার মধ্যে বিজয়-১ এর মধ্যে ফেঞ্চুগঞ্জে কাজ শুরু করেছে।

বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মর্তোজা আহমেদ ফারুক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এখন গ্যাসের যে চাপ আছে তাতে দৈনিক এ কূপ থেকে এক কোটি থেকে এক কোটি ২০ লাখ ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাবে। অনুসন্ধান কূপের ক্ষেত্রে ছয় মাস খুব বেশি সময় নয় বলে দাবি করেন তিনি। তবে এখনই কতটা মজুদ আছে তা বলা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, নিচের দুটি স্তরে গ্যাস পাওয়া গেলে ক্ষেত্রটি অনেক বড় গ্যাস ক্ষেত্র হিসাবে বিবেচিত হতো। সুন্দলপুরে দ্বিমাত্রিক ভূতাত্ত্বিক জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণ করে বাপেক্স ২০০৭ সালে গ্যাসাধারের সন্ধান পাওয়ার পর ওই বছর অক্টোবরে অনুসন্ধানে কূপ খনন শুরু করে। সুন্দলপুর প্রকল্পটি ২০০৮ সালের ২২ মে একনেক বৈঠকে অনুমোদন পায়। রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে প্রকল্পের জন্য ৭৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। রিগ সংকটসহ বিভিন্ন কারণে সময়মতো অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়নি। অবশেষে গত বছরের নভেম্বরে কূপ খননের কাজ শুরু হয়। একই বছর ২১ ডিসেম্বর বিদ্যুত্, জ্বালানি এবং খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এনামুল হক প্রকল্পের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। কয়েক মাস ধরে তিন হাজার ২০০ মিটারের বেশি গভীরতায় খনন করে বাপেক্স। কিন্তু ড্রিল স্টিম টেস্ট (ডিএসটি) এর ফলাফল বিশ্লেষণ করে দুটি স্তরে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পরবর্তীকালে তুলনামূলক কম গভীরতায় বুধবার গ্যাস স্তরের সন্ধান পায় বাপেক্স।

উত্সুক এলাকাবাসীর ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ

কোম্পানীগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, গতকাল সকাল ৭টায় তারা ১ নং কূপে গ্যাসের বুদ্বুুদ নিশ্চিত হয়ে সেখানে প্রদীপ জ্বালায়। গ্যাস প্রাপ্তির সন্ধান পাওয়ার খবর এলাকাবাসীর কাছে পৌঁছলে তারা একনজর দেখার জন্য কূপের আশেপাশে ভিড় করে এবং এ ভিড় সামলাতে কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছে।

সুন্দলপুর গ্যাস অনুসন্ধান কাজের প্রকল্প পরিচালক আব্দুল হালিম ও ডিআইজি শহীদ উল্লাহ জানান, ২০০৮ সালে বাপেক্সে জরিপ করে কোম্পানীগঞ্জে সিরাজপুরের শাহাজাদপুর গ্রামে সুন্দলপুরে গ্যাসের সন্ধান নিশ্চিত হলে তখন থেকে কাজ শুরু করে। গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভাবনা নিশ্চিত হয়ে এর ৩ মাস পূর্ব থেকেই তারা এখানে ৭ একর ভূমি নিয়ে কাজ শুরু করেন। বর্তমানে এ প্রকল্পে কর্মকর্তাসহ প্রায় দেড় শতাধিক কর্মচারী কাজ করছে। ইতিমধ্যে প্রকল্প এলাকার গ্যাস উত্তোলনের প্রয়োজনীয় অবকাঠামোসহ আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি বসানোর কাজও প্রায় শেষ হয়েছে।

August 16th, 2011

ত্রিপোলি ঘিরে ফেলেছে বিদ্রোহীরাগাদ্দাফিরদেশ ত্যাগের প্রস্তুতি!

লিবিয়ার বিদ্রোহীরা গোটা দেশ থেকে রাজধানী ত্রিপোলিকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সম্প্রচার সংস্থা আল জাজিরা এবং ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, বিদ্রোহীরা দাবি করেছে যে তারা চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে রাজধানী ত্রিপোলি। বিদ্রোহীরা ত্রিপোলি অভিমুখে বিরামহীন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তিউনিসিয়ার রাজধানী তিউনিসে লিবিয়ার সংঘাত বিষয়ক জাতিসংঘ দূত আব্দুল্লাহ আল-খতিব এসে পৌঁছুবার পর বিদ্রোহীরা তাদের হামলা জোরদার করেছে।

ত্রিপোলি থেকে এএফপি জানায়, লিবীয় নেতা মুয়াম্মার আল গাদ্দাফি দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। পাশাপাশি বিদ্রোহীরা বিভিন্ন শহর বিশেষ করে পশ্চিমাঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে। তবে লৌহমানব গাদ্দাফি বিদ্রোহী বাহিনী ও আন্তর্জাতিক সামরিক জোট ন্যাটোকে একেবারেই গ্রাহ্য করছেন না।

গাদ্দাফি লিবিয়ার বিদ্রোহী বাহিনী ও ন্যাটোকে ‘ইঁদুর’ ও ‘ঔপনিবেশিক শক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করে এদের বিরুদ্ধে অভিযান শিগগিরই শেষ হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি সোমবার লিবীয় টেলিভিশনে এক অডিও বার্তায় এ আশাবাদ প্রকাশ করেন। লিবিয়ার সংবাদ সংস্থা জানায়, এই অডিও বার্তার সারসংক্ষেপ প্রকাশ করেছে।

তিনি বলেন, ‘ঔপনিবেশিক ইঁদুরদের সময় প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। বিদ্রোহীরা এখন এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি পালিয়ে বেড়াচ্ছে।’ তিনি বিদ্রোহীদের প্রতিরোধ ও তাদের দখলকৃত শহর মুক্ত করতে তার সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। বিদ্রোহীরা জাবিয়াহ, সরম্যান ও ঘারইয়ানসহ পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন শহরের দিকে অগ্রসর হওয়ার দাবি করেছে। ত্রিপোলির কেন্দ্রস্থল গ্রীণ স্কয়ারে শত শত গাদ্দাফি সমর্থকের সমাবেশের সচিত্র প্রতিবেদন লিবীয় টেলিভিশনে প্রচার করা হয়েছে। তারা এ সময় লিবিয়ার জাতীয় পতাকা উড়াচ্ছিল। সরকারের মুখপাত্র মুসা ইব্রাহিম জানান, গত কয়েকদিনে বিদ্রোহীরা যেসব জেলা ও শহরের দিকে অগ্রসর হয়েছে সেগুলো গাদ্দাফির সশস্ত্র বাহিনী পুনর্দখল করতে সক্ষম। তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমাদের মুজাহিদীন বাহিনী এসব সন্ত্রাসীদের নির্মূল করতে সক্ষম।’ ইব্রাহিমের উদ্ধৃতি দিয়ে সংবাদ সংস্থা জানার খবরেও বলা হয়, গাদ্দাফি বাহিনী রবিবার জাবিয়াহ শহরেও বিদ্রোহীদের অভিযান প্রতিহত করেছে। অন্যদিকে সরকারি মুখপাত্র স্বীকার করেছে, বিদ্রোহীরা সন্ত্রাসবাদের বিস্তার ঘটাতে জেবেল নাফুসা এলাকার ঘারইয়ান শহরে প্রবেশ করেছে। তবে এ নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই। কারণ সরকারি সৈন্যরা আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এ শহর পুনর্দখল করতে সক্ষম হবে। ইব্রাহিম ত্রিপোলির ৭০ কিলোমিটার পশ্চিমে সরম্যান শহরেও সমস্যার কথা স্বীকার করেছেন। এ শহরে সংঘর্ষ চলছে। তবে সেনাবাহিনীর সহায়তায় শত শত স্বেচ্ছাসেবী সমস্যা মোকাবেলায় লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

ত্রিপোলি থেকে রয়টার্স জানায়, লিবিয়ার বিদ্রোহীদের সাথে গাদ্দাফি সরকারের প্রতিনিধিরা আলোচনা শুরু করেছে বলে জানা গেছে। রবিবার রাতে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র তিউনিসিয়ার একটি দ্বীপে এই আলোচনা শুরু হয় বলে একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন। তবে এ খবর অস্বীকার করেছেন লিবীয় সরকারের মুখপাত্র মুসা ইব্রাহিম। বিদ্রোহীদের সাথে সরকারের বৈঠকের বিষয়ে জানে এমন এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, দক্ষিণ তিউনিসিয়ার জেরবা দ্বীপের একটি হোটেলে বিদ্রোহীদের সাথে আলোচনা শুরু করেছে লিবিয়া সরকারের প্রতিনিধিরা। বিদ্রোহীদের সাথে কোনো ধরনের আলোচনা শুরুর বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করে লিবীয় সরকারের মুখপাত্র মুসা ইব্রাহিম এ ধরনের গুজব ছড়ানোর জন্য পশ্চিমা সরকার ও সংবাদমাধ্যমগুলোকে দায়ি করেছেন।

এদিকে, লিবীয় নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি তার ভাষায়, ন্যাটো ও বিশ্বাসঘাতকদের হাত থেকে লিবিয়াকে মুক্ত করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। সোমবার সকালে লিবিয়ার সরকারি টেলিভিশনে প্রচারিত এক অডিও ভাষণে গাদ্দাফি এ আহ্বান জানান। ভাষণটি সরাসরি সম্প্রচারিত বলে দাবি করা হয়েছে। লিবিয়ার বিদ্রোহীরা রাজধানী ত্রিপোলির দিকে অগ্রসর হওয়ার লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর দখল করার একদিন পর গাদ্দাফি এ আহ্বান জানালেন। ত্রিপোলি থেকে ৫০ কিলোমিটার পশ্চিমে বিদ্রোহীদের দখলীকৃত উপকূলীয় শহর জাবিয়ার পথ ধরেই তিউনিসিয়া থেকে ত্রিপোলিতে খাদ্য ও জ্বালানি রসদ সরবরাহ করা হয়। ভাষণে গাদ্দাফি বলেন, লিবিয়ার মানুষ বেঁচে থাকবে, ফাতাহ বিপ্লবও বেঁচে থাকবে। জাগো, এগিয়ে যাও, তোমার অস্ত্র তুলে নাও, প্রতিরোধ করো, লিবিয়ার প্রতি ইঞ্চি মাটিকে ন্যাটো ও বিশ্বাসঘাতকদের হাত থেকে মুক্ত করার লড়াইয়ে সামিল হও। সবাইকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শহীদের রক্তই যুদ্ধের প্রেরণা। ১৯৬৯ সালে ফাতাহ বিপ্লবের মাধ্যমে গাদ্দাফি লিবিয়ার ক্ষমতা দখল করেন।

বিদ্রোহীরা জাবিয়া দখল করেও নিলেও ত্রিপোলিতে এখনই কোন গুরুতর হুমকি সৃষ্টি হবে না বলে জানিয়েছে রয়টার্স। তবে শহরটি দখলের মাধ্যমে ত্রিপোলির পশ্চিমদিকের উপকূলীয় এলাকাও বিদ্রোহীদের দখলে চলে এলো। ত্রিপোলির পূর্ব উপকূল আগে থেকেই বিদ্রোহীদের দখলে রয়েছে। চলতি বছর ফেব্রুয়ারি থেকে গাদ্দাফি সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এখন সবচেয়ে সুবিধাজনক ও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে বিদ্রোহীরা।

August 16th, 2011

মুশফিক-বীরত্বের পরও সিরিজ হাতছাড়া

সিরিজে বাকি আরও দুটি ম্যাচ। তবে এর আগেই ৩-০ করে ফেলল স্বাগতিক জিম্বাবুয়ে! আর ব্যাটে-বলে সমানতালে ব্যর্থ হয়ে বাংলাদেশ করল সিরিজ হাতছাড়া।
ঘুরে দাঁড়ানো হলো না সাকিব আল হাসানদের। ৪ উইকেট, ৭ উইকেটের পর আজ তৃতীয় ওয়ানডেতে বাংলাদেশের হার ৫ রানে। সিরিজ হাতছাড়া হওয়ায় এখন বাংলাদেশ দলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ‘হোয়াইটওয়াশ’ ঠেকানো!
১০০ বলে ১০১ রান—৮ চার, ১ ছয়। বীরোচিত ইনিংস খেলে বাংলাদেশকে জয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিলেন মুশফিকুর রহিম। তবে নায়কের বদলে এখন উল্টো মুশফিককে ‘খলনায়ক’ বলেও আখ্যায়িত করতে পারেন অনেকে! ৫ বলে প্রয়োজন ছিল মাত্র ৬ রান। হাতে শুধু একটি উইকেট। এ অবস্থায় কী দরকার ছিল ওভাবে তুলে মারার? তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে মুশফিক ক্যাচ-আউট হলেন—অলআউট হয়ে গেল বাংলাদেশও!
প্রথম দুই ম্যাচে দলের হার ডেকে এনেছিলেন ব্যাটসম্যানরা, ১৮৪ ও ১৮৮ রানে অলআউট হয়ে। আজ হার ডেকে আনার দায়িত্বটা যেন পড়েছিল বোলারদের ওপর! বাংলাদেশি বোলারদের চোখরাঙিয়ে মাসাকাদজা করলেন ৭৪ রান, টাইবু খেললেন ৮৩ রানের ইনিংস। এই দুই ব্যাটসম্যানের ব্যাটের ওপর ভর করে জিম্বাবুয়ের সংগ্রহ দাঁড়াল ২৫০! জিম্বাবুয়ের সফরে গিয়ে অসহায় সাকিব-তামিমদের কাছে সংগ্রহটা বিস্ময়েরই বটে!
হতাশার মধ্যেও ব্যাটসম্যানদের ধন্যবাদ না দিয়ে উপায় নেই। উদ্বোধনী জুটিতে এলো ৫০ রান। প্রথম দুই ম্যাচে ৪ ও ৩ করা তামিম ইকবাল খেললেন ৪৪ রানের ইনিংস। আশরাফুলের জায়গায় খেলতে আসা শুভাগত হোম অভিষেক ম্যাচে করলেন ৩২ রান। মুশফিকুর রহিম সেঞ্চুরি করলেন। কম কীসে!
সংক্ষিপ্ত স্কোর—
জিম্বাবুয়ে: ২৫০/৭ (৫০ ওভার)
টাইবু ৮৩, মাসাকাদজা ৭৪
রুবেল ৪১/২, সাকিব ৪৬/২
বাংলাদেশ: ২৪৫/অলআউট (৪৯.২ ওভার)
মুশফিক ১০১, তামিম ৪৪
উেসয়া ৪৭/৩, পোফু ৪৩/২, জারভিজ ৫২/২

August 16th, 2011

‘মাস্টর, তোর ছাত্র কই’

গীতালি দাশগুপ্তা

বিডিনিউজ: পঁচাত্তরের ১৪ই আগস্ট রাতে শেষবার শিশু রাসেলকে পড়িয়েছিলেন তিনি। ফিরে যাওয়ার সময় একটি বারের জন্যও মনে হয়নি আর কখনও পড়ানো হবে না, দেখা হবে না। ৩৬ বছরের ‘পুরনো’ সে কষ্টস্মৃতি হাতড়ে বলছিলেন শেখ রাসেলের গৃহশিক্ষিকা গীতালি দাশগুপ্তা, যিনি ’৭২ থেকে তিন বছর পড়িয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট ছেলে রাসেলকে। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে তার ছিল নিবিড় সম্পর্ক। বাহাত্তরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় স্নাতকোত্তর শ্রেণীর ছাত্রী ছিলেন তিনি। ওই বছরের আগস্ট বা সেপ্টেম্বর থেকে তিনি রাসেলকে পড়ানো শুরু করেন। এরপর বদরুন্নেসা কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন ’৭৪ সাল থেকে। সেই সূত্রে শেখ রেহানার শিক্ষিকাও ছিলেন গীতালি।
কষ্টস্মৃতির সেই কথা বলতে গিয়ে বারবার কণ্ঠ কেঁপে উঠেছে গীতালি দাশগুপ্তার।
‘আমাকে রাসেল ডাকতো আপু বলে। আর আমার কাছে ওর নাম ছিল বুচু। ওইদিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িটি থেকে পড়িয়ে বের হই। কথা ছিল পরদিন আবার পড়াতে যাবো।
‘ওইদিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে আমি তাকে পড়াতে যাই। আমাকে জানানো হলো, রাসেল আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসায় গেছেন। ফোন করলেই ফিরে আসবে। একটু পর বঙ্গবন্ধু এসে আমাকে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন- মাস্টর, তোর ছাত্র কই? তুই একা কেন?’
এরপর বঙ্গবন্ধু নিজেই সেরনিয়াবাতের বাসায় ফোন করে রাসেলকে আসতে বলেন, বলেন গীতালি। ‘ফোন রেখেই আমাকে বললেন, ‘মাস্টর তোমার ছুটি নাই।’ এটাই ছিল আমাকে বলা বঙ্গবন্ধুর শেষ বাক্য। অথচ তাকেই ছুটি দিয়ে দিলাম আমরা।’ গীতালি দাশগুপ্তের এই কথাগুলোতে একটু ক্ষোভ কী ঝরে পড়লো না! আবার বলতে শুরু করেন সেই শেষ দিনের কথা। শেষ পড়ানোর কথা। ‘শেষ দিন রাসেল পড়লো আমার কাছে। ফিরে আসার আগে অনেক্ষণ কথা হলো বেগম মুজিবের সঙ্গে, যাকে আমি কাকিমা বলে ডাকতাম। বিশ্বাস করে আমাকে অনেক কথা বললেন। এতো বিশ্বাস একটা মানুষকে কীভাবে করে। রাত ১১টার পর বঙ্গবন্ধুর এক নিরাপত্তাকর্মী গাড়িতে করে আমাকে পৌঁছে দেন।’
এরপরের কথা সবার জানা। সপরিবারে খুন করা হয় বঙ্গবন্ধুকে। দেশে না থাকার কারণে বেঁচে যান দু’মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। ঊনসত্তরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াকালীন খরচ চালানোর জন্য গ্রহশিক্ষিকার দায়িত্ব নেন গীতালি দাশগুপ্ত। প্রথমে তিনি আওয়ামী লীগের তৎকালীন কোষাধ্যক্ষ মোহাম্মদ মহসিনের তিন মেয়েকে পড়ানোর দায়িত্ব নেন। আর মহসিনের সুপারিশেই রাসেলকে পড়ানোর দায়িত্ব, দেয়া হয় তাকে।
‘ফোরেই শেষ হলো রাসেলের পড়া’
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সেই বাড়িতে প্রথম যাওয়ার কথা তুলে ধরে গীতালি বলেন, ’৭২ সালের আগস্ট কী সেপ্টেম্বর মাসে তিনি ওই বাড়িতে যান। প্রথম দিন সকাল ১০টার দিকে যান তিনি বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে। তাকে নিয়ে বসানো হয় দোতলার পেছনের দিককার বসবার ঘরে।
‘রাসেলের পড়াশোনা নিয়ে খুবই চিন্তিত ছিলেন বেগম মুজিব। কোন শিক্ষকেই পছন্দ হতো না রাসেলের। কাকিমা এসে আমার সঙ্গে পরিচিত হয়ে রাসেলকে ডেকে পাঠালেন। ছোট একটা ছেলে। সাড়ে পাঁচ, কী ছয় বছরের হবে। পায়জামা আর হাউজ কোট পরা। মাথার চুল এলোমেলো।’
বইয়ের ঝোলা নিয়ে রাসেল আসতেই বেগম মুজিব তার ছোট ছেলেকে গীতালির পাশে বসিয়ে দিলেন। রাসেল তখন ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের ছাত্র ছিল।
গীতালি স্মৃতি হাতড়ে বললেন, ‘আমি কাকিমাকে বললাম, আমি রাসেলকে পড়াতে পারবো না। তখন তিনি ১৫-২০ মিনিটের জন্য হলেও পড়াতে বললেন। আমি বললাম, আমার তো বাসায় ফিরতে রাত হয়ে যাবে। তিনি আমার বাসায় পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব নিলেন। পরের দিন থেকেই রাসেলকে পড়াতে শুরু করি।
‘এভাবেই আমার শুরু। ও তো আর ফাইভে ওঠা হলো না। ফোরেই সব শেষ হয়ে গেলো।’
ছাত্র রাসেল সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘পড়ানো শুরু করার ২৭/২৮ দিনের মধ্যে বুঝতে পেরেছেলাম, ওর ভেতরে আমি জায়গা করে নিতে পেরেছি। আমরা সঙ্গে ওর রাগ ছিল, ওর ক্ষোভ ছিল। তবে আমার প্রতি ওর অসম্ভব ভালোবাসাও ছিল।’
প্রিয় ছাত্রের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কখনো থেমে গেছেন। কখনও, চোখের কোণে পানি আর বাষ্পরূদ্ধ কণ্ঠে কথা বলেছেন।
‘মাস্টর, তোর ছাত্রের খবর কী’
গীতালি দাশগুপ্তা যখন রাসেলকে পড়ানো শুরু করেন তখনও পুতুলের জন্ম হয়নি। শুধু রাসেলের শিক্ষক হিসেবে বাড়ির প্রতিটি লোক তাকে একটু আলাদা চোখেই দেখতেন।
‘বঙ্গবন্ধু সবার শ্রদ্ধার, সবার কাছেই ছিলেন নমস্য। তখন তো বয়সে ছোট ছিলাম। বুঝতাম না। আমার প্রতি যে কৃতজ্ঞতা বোধ, কাকার (বঙ্গবন্ধু) আর কাকিমার। ওই বাড়ির প্রতিটি লোকের যে কৃতজ্ঞতা বোধ- আমি এরকমটি দেখিনি।’ ‘বঙ্গবন্ধু যে কী ধরনের মানুষ ছিলেন, যারা তাকে কাছ থেকে না দেখেছে- তারা বুঝবে না। আমি জানি না- এটা আমার ভাগ্য, না দুর্ভাগ্য। আমি মনে করি এটা আমরা দুর্ভাগ্য। এতো কষ্ট পাচ্ছি কেন? এই কষ্টটা পাওয়ার জন্যই মনে হয় ওনাদের সঙ্গে সম্পর্ক,’ বললেন গীতালি। ‘আমার সঙ্গে দেখা হলেই বঙ্গবন্ধু বলতেন- মাস্টর তোর ছাত্রের খবর কী? আর, তোর কী খবর?’ বঙ্গবন্ধুর সাধারণ জীবনযাপনের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর জন্য যে ট্রলিতে করে খাওয়া নিয়ে যেতে আমার জন্যও সেই ট্রলিতেই খাওয়া আসতো।’ গীতালি জানালেন, একবার রাসেলের খুব জ্বর হয়েছিল। সে জ্বরের সময়েও তাকে সময়ে অসময়ে যেতে হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে। কারণ রাসেল খাচ্ছিল না। তিনি খাওয়ার পর রাসেলে গলা দিয়ে খাবার ঢুকতো। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা সম্পর্কে জানালেন, খুবই প্রাণবন্ত ছিলেন শেখ হাসিনা। সেই সঙ্গে দুষ্টুমিও বেশ করতেন তিনি। আর বদরুন্নেসা কলেজে পড়তো শেখ রেহানা। ওর আচরণে কেউ বুঝতেই পারতো না- ও কার মেয়ে।’
‘আপু, আপনি আব্বাকেও পড়াইছেন?’
গিতালী দাশগুপ্তা বলেন, বঙ্গবন্ধুর আন্তরিকতা ছিল অন্য রকমের। উনি বাড়িতে ছিলেন, আর আমার সঙ্গে দেখা হয়নি- এমনটি কোন দিনও হয়নি। আর, ওনাকে দেখে কোন দিন দাঁড়াতে পারিনি। উনি কাঁধে ধরে বসিয়ে দিতেন। বলতেন, বয় বয় বয়। তুই তোর জায়গায় বয় মাস্টর। খোঁজ নিতেন ছেলের লেখাপড়ার।
‘বঙ্গবন্ধু প্রায়ই একটা কথা বলতেন- রাসেল, ও শুধু তোমার টিচার না। ও আমারও টিচার। বঙ্গবন্ধু ঘর থেকে গেলেই রাসেল বলতো, আপু আপনি কী আব্বাকেও পড়াইছেন?’
‘জেঠুর ওপর অনেক রাগ হয়’
‘৭৫ সালের প্রথম দিকে গীতালি একবার কলকাতায় গিয়েছিলেন। সেখানে তার জেঠু রাসেলের কুণ্ডলী হিসেব করে জানিয়েছিলেন- বেঁচে থাকলে রাসেল অনেক বড় হবে। এখন সেই জেঠুর ওপর গীতালির অনেক রাগ।
গীতালি বললেন, ‘আমি ঢাকায় এসে ওই কথাটা কাকিমা্থকে বললাম, সামনে হাসু আপাও (শেখ হাসিনা) ছিলেন। হাসু আপা বললেন, গীতালি আমি সব লিখে দেবো, তুমি একটু পাঠিও তো। সেই সুযোগ তো এলো না। তার আগেই সব শেষ হয়ে গেলো।’ ছোট রাসেলের বড় মনের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি বলেন, সে কতো বড় মনের অধিকারী ছিল- তা বলে বোঝানো যাবে না। বিশেষ একদিনের ঘটনা বর্ণনা দিয়ে বললেন, ‘রাসেলকে একদিন গৌতম বুদ্ধ সম্পর্কে বললাম। পরের দিন ওই বাড়িতে যেতেই বঙ্গবন্ধু বললেন, তুই আমার সর্বনাশ করছস। পাশে কাকিমা আর তা গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল রাসেল। বঙ্গবন্ধু আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত দিয়ে কাকিমাকে বললেন- কামালের মা তোমারে আমি বলছিলাম না, যে ঠিক টিচার আমি পায়া গেছি। বঙ্গবন্ধু বললেন, রাসেল তাকে আগের রাতে বলেছে- উনি কেন গৌতম বুদ্ধ হয়ে যান না।’
‘পরের বার বিষ খায়ো’
গীতালি জানান, রাসেল একবার হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষায় অংকে ফেল করে। তাতে ওর অনেক মন খারাপ হয়। শেখ রেহানা ছোট ভাইয়ের ফল নিয়ে হাসাহাসি করছে। ‘আমি রাসেলকে বললাম, আমি বিষ খাবো। আর, তোমাকেও পড়তে হবে না। রাসেল কাঁদতে কাঁদতে বললো, তুমি এবার বিষ খায়ো না। পরের বার খায়ো। পরে বার্ষিক পরীক্ষার ফল দেখিয়ে বলেছিল- বললাম না বিষ খায়ো না। আমি পাস করছি।’ রাসেল যে গীতালিকে কতো পছন্দ করতো তা তিনি জানতে পেরেছিলেন শেখ কামালের বিয়ের সময়। ‘জ্বর ছিল বলে আমি শেখ কামালের বিয়ের অনুষ্ঠানে যেতে পারিনি। পরে কাকিমার মুখে শুনেছি- বিয়ের প্রায় পুরো সময়টাতেই রাসেল গেইটে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল আমরা অপেক্ষায়।’ রাসেলের এ শিক্ষক বর্তমানে আজিমপুরে নিজের বাড়িতে অবসর দিন যাপন করছেন। কয়েক বছর হলো নোয়াখালী কলেজ থেকে অবসরে যান তিনি।

August 15th, 2011

“Sheik Mujib killing mission and informative unknown history”

ইতিহাসের নৃশংসতম বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জিয়াউর রহমান, মওলানা ভাসানীসহ ঘাতক চক্রের ভূমিকা

You should check it to know details….It should be known to all of us as a Bangladeshi.

http://blog.bdnews24.com/dr_mushfique/32569

August 14th, 2011

‘ম্যাডাম ইন্দিরা, চিন্তা করবেন না – কোনো বাঙালি আমার গায়ে হাত তুলবে না’ : লেখক: ড. কামাল হোসেন

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব , শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী

তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে বঙ্গবন্ধু এটা জানতেন। জ্যামা-ইকায় কমন-ওয়েলথ সম্মেলনে ভারতের তত্-কালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধু যেখানে বসেছিলেন সেখানে উঠে এসে বলেছিলেন, ‘শেখ সাহেব, আমাদের কাছে উদ্বেগজনক খবর আসছে। আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে।’ উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘ম্যাডাম ইন্দিরা, চিন্তা করবেন না। কোন বাঙালি আমার গায়ে হাত তুলবে না। যদি তোলে চাদর ঘাড়ে নিয়ে গ্রামে চলে যাব। ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার লোক শেখ মুজিব না।’

এমনকি বঙ্গবন্ধু যখন ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠন করেন তখন আমি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে চলে যাই উচ্চতর পড়াশোনার জন্য। মার্চে বঙ্গবন্ধু ডেকে পাঠান। তার সঙ্গে দেখা করলে তিনি বলেন, ‘খবর রাখো। কিছু ক্যাপ্টেন, মেজরের সঙ্গে মন্ত্রী সভার সিনিয়র কলিগরা রাতে মিটিং করছে।’ তিনি তখনই আমাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে জয়েন করার কথা বলেন। তার পরপরই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জ্যামাইকা যাই।

আর যখন বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয় তার পরপরই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো বাংলাদেশকে ‘ইসলামী রিপাবলিক অব বাংলাদেশ’ হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করে। আর এ স্বীকৃতি প্রদানের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয় যেম, এ হত্যাকাণ্ডে পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

১৫ আগস্টের সময় আমি যুগোশ্লাভিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে ছিলাম। জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে যুগোশ্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কী ভাষণ দেবেন এ নিয়ে পরামর্শ করতে সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আমন্ত্রণে আমি সেখানে গিয়েছিলাম। বেলগ্রেডে থাকতেই আমি বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার খবর পাই। সেই সময় শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা জার্মানির কালর্সরুই শহরে ছিলেন ড. ওয়াজেদ মিয়ার কাছে। খবর পেয়ে প্রথমেই ঠিক করি বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ের সঙ্গে দেখা করবো। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জার্মানিতে পৌঁছে যাই। ১৫ আগস্ট বিকাল সাড়ে চারটায় শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও ড. ওয়াজেদ মিয়া বনে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর বাসায় পৌঁছান। সেখানেই আমি শেখ হাসিনাদের সাথে মিলিত হই। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।

আমি ঠিক করি প্রথমে লন্ডনে যাব। সেখানে গিয়ে ঠিক করবো পরবর্তী করণীয়। এসময় ড.ওয়াজেদ মিয়া ও শেখ হাসিনা আমাকে বলেন, আমি যেন কোনভাবেই মোশতাকের সরকারে যোগ না দেই। আমি তাকে আশ্বস্ত করি যে, কোনভাবেই আমি এই ঘৃণ্য কাজ করবো না এবং আমি তা করিও নি।

লন্ডনে পৌঁছেই আমি হাইকমিশনারকে লাল পাসপোর্টের বদলে সবুজ পাসপোর্ট দিতে বলি। এ সময় ঢাকা থেকে বারবার আমার খোঁজ করা হচ্ছিল। লন্ডনেও ফোন করে বলা হয়েছে ড. কামাল হোসেনকে পেলে সঙ্গে সঙ্গে যেন ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় আমার খবর তারা পাননি। আমি সবুজ পাসপোর্ট নিয়ে অক্সফোর্ডে উচ্চতর পড়াশোনা শুরু করি।

এসময় বারবার ঢাকা থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে। মেজর জিয়া রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেও আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে বলেছিলেন সরকারে যোগ দিতে। এমনকি বিদেশে ডেলিগেট টিমের নেতৃত্ব দিতেও অনুরোধ করেছিলেন কিন্তু আমি রাজি হইনি। সরাসরি না করেছি। বলেছি, এই অবৈধ সরকারের সঙ্গে আমার সম্পর্ক রাখা সম্ভব না।

এ সময় দেশে আওয়ামী লীগের সংগঠনকে গুঁড়িয়ে দেয়ার সব রকম প্রচেষ্টা চলছিল। কিন্তু জোহরা তাজউদ্দিনের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আবার ঘুরে দাঁড়ায়। তিনি সারাদেশে ঘুরে ঘুরে ঐতিহ্যবাহী এই দলটিকে আবারও মাথা তুলে দাঁড়াবার শক্ত ভিত্তি দেন। এ সময় ১৯৮০ সালে সংগঠন আবারও পুরোপুরিভাবে দাঁড়িয়ে যায়। এসময় লন্ডনে আসেন শেখ হাসিনা। সেখানেও আমার সঙ্গে কথা হয়। বলেন, আমাকে ছেড়ে যাবেন না।’ আমরা তখন শেখ হাসিনার সসম্মানে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করি। এসময় দলের সাংগঠনিক কাঠামো বদলানো হয়েছিল। কেননা, তখন দলের ভেতরে গ্রুপিং-এর আভাস দেখা দিয়েছিল। সেইজন্য যৌথ নেতৃত্ব কাঠামোর মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা দলের চেয়ারম্যান হন। ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে দলের হাল ধরেন শেখ হাসিনা।

August 14th, 2011

বেক্সিমকোর দেড় কোটির বেশি শেয়ার ছাড়ার ঘোষণা

অর্থনৈতিক রিপোর্টার: বেক্সিমকো লিমিটেড পুঁজিবাজারে ১ কোটি ৬৪ লাখ ৯০ হাজার ৪৬৩টি শেয়ার ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। এর মাধ্যমে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিবিধ খাতের এ কোম্পানিটি বাজার থেকে ১৬ কোটি ৪৯ লাখ চার হাজার ৬৩০ টাকা সংগ্রহ করবে। সমপ্রতি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ এই অনুমোদন দিয়েছে। তবে বিশেষ সাধারণ সভায় শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন ও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) আনুমোদনের পর সিদ্ধান্তটি কার্যকর হবে বলে ডিএসই সূত্রে জানা গেছে। জানা যায়, পরিচালনা পর্ষদ কোম্পানির প্রতিটি শেয়ারের দাম নির্ধারণ করেছে ১০ টাকা। এছাড়া বেক্সিমকোর অনুমোদিত মূলধন ৫০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরিচালনা পর্ষদ। আর এই টাকা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ইন্টারন্যাশনাল নিটওয়্যার অ্যান্ড অ্যাপারেলস লিমিটেড, বেক্সিমকো ফ্যাশন লিমিটেড, ক্রিসেন্ট ফ্যাশন অ্যান্ড ডিজাইন লিমিটেড ও ফ্রেসটেক্স বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেড এবং বিইএল টাওয়ারসহ বেক্সিমকো ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের জমি ও ভবন অধিগ্রহণ করবে।
প্রতিষ্ঠানটির ইজিএম আগামী ১৫ই সেপ্টেম্বর সকাল ১০টায় বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, সারাবো, কাশিমপুর, গাজীপুরে অনুষ্ঠিত হবে। ইজিএমের রেকর্ড ডেট আগামী ২৫শে আগস্ট।