পথেই ওদের জন্ম, বেড়ে উঠা। থাকা-খাওয়া, বিয়ে-সংসার সবই হচ্ছে ফুটপাতে। কাগজ টুকিয়ে, রিকশা-ভ্যান চালিয়ে, হোটেল বা বাসাবাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে ওরা। বছরের পর বছর ধরে চলছে কয়েক হাজার ছিন্নমূল মানুষের এই কায়দায় বসবাস। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম ও মাওলানা ভাসানি জাতীয় হকি স্টেডিয়ামের বারান্দা-ফুটপাতই তাদের ঘর-দুয়ার। দারিদ্র্য, নদী ভাঙ্গন, পিতা-মাতার বিবাহ বিচ্ছেদ, বহু বিবাহ, অকাল মৃত্যু, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনসহ নানা কারণে এ সব মানুষ পথে আসতে বাধ্য হয়েছে। বৃত্তাকার দুই স্টেডিয়ামের বারান্দা ও রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে নারী-পুরুষ রাত যাপন করার দৃশ্য দেখলে মনে হয়, এটা যেন এক ভিন্ন জগত্, ভিন্ন সমাজ।
গত বুধবার রাত ১১টায় ইত্তেফাকের আলোকচিত্র সাংবাদিক সাইফুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে এই প্রতিনিধি বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম ও মাওলানা ভাসানি জাতীয় হকি স্টেডিয়ামের বারান্দা ও ফুটপাতে সরেজমিনে গিয়ে দেখতে পান শিশু থেকে বয়স্ক পর্যন্ত অসংখ্য মানুষ সারিবদ্ধভাবে ঘুমাচ্ছে। কেউ কেউ বসে জীবনের সুখ-দুঃখের গল্প করছে। তবে এরা শুধু রাত ১১টা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত স্টেডিয়ামের বারান্দা ও ফুটপাতে ঘুমাতে পারে। সূর্য উঠার পর কাউকে ফুটপাতে দেখা যায় না। তাদের এই নির্ধারিত সময় বেধে দিয়েছে স্টেডিয়াম এলাকার দোকান মালিক এবং নাইট গার্ডগণ। নাইট গার্ডরা তাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করে থাকে। মানুষ মানুষের জন্য এই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন স্টেডিয়াম দোকান মালিকগণ। তারা প্রতিটি দোকানের সামনে এই অসহায় মানুষদের ফুটপাত ও রাস্তায় ঘুমাতে সুযোগ দিয়েছেন।
নিরীহ নারী-পুরুষরা জানান, দোকান মালিকরা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত আমাদের ঘুমাতে দেন। স্টেডিয়ামে রাত যাপনে ক্রীড়া পরিষদও এই অসহায় লোকদের প্রতি অনুরূপ মহানুভবতা দেখাচ্ছে। এসব বিত্তহীন মানুষের পক্ষে ঘর ভাড়া দিয়ে থাকা সম্ভব নয়। সারাদিন দিনমজুরের কাজ কিংবা অনেকে ভিক্ষা করে জীবিকার সন্ধানে ব্যস্ত থাকে। সারাদিনে কেউ একশত থেকে তিনশত টাকা পর্যন্ত আয় করে থাকে। এই টাকা বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে দুই বেলা খাবারে ব্যয় হয়। এরপর স্ত্রী সন্তানের কাপড় চোপড় ক্রয় করতে হয়। সারাদিনের পরিশ্রমের ফসল সামান্য আয় দিয়ে শুধু ফুটপাতেই একজন কোনরকমে টিকে থাকতে পারে। পরিবারের সদস্যদের কিংবা স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে এই সামান্য কয় টাকা দিয়ে বেঁচে থাকা খুবই কষ্টদায়ক।
শিশু, কিশোরসহ নারী-পুরুষের সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেন, তাদের কারো কারো জন্ম এই স্টেডিয়ামের বারান্দায়, কারো বিয়ে হয়েছে এখানে, কেউ ২০ থেকে ৩০ বছর যাবত্ এখানেই রাত কাটায়। তাদের জীবনে চরম দুর্বিষহ অবস্থার কথা বলতে বলতে অনেকে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। সূর্য উঠার সঙ্গে সঙ্গে কাজের সন্ধানে তারা ছুটে যায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়। রাত ১০টা বাজলে ঘুমানোর জন্য ছুটে আসে স্টেডিয়ামের বারান্দার ফুটপাতে। মাত্র একটি গামছা, লুঙ্গি ও পলিথিন হলো তাদের বিছানা। বালিশ হিসাবে ছেঁড়া, টুকরা কাপড় পোঁটলা করে মাথার নিচে দিয়ে রাত কাটায়। কোন মশারি নেই। ঘুমন্ত শিশু, নারী ও পুরুষদের হাতে-পায়ে মশা কামড়াতে দেখা যায়। ঠিকমত তাদের গোসল করা সম্ভব হয় না। পাবলিক টয়লেটে প্রতিজন গোসল করতে ১০ টাকা ও মলমূত্র ত্যাগে পাঁচ টাকা ব্যয় হয়। এ কারণে অনেকে দুই থেকে তিন দিন পর গোসল করে থাকে। অনেক সময় মলমূত্র পাশের ড্রেন ও বঙ্গভবন পার্কে সেরে নেয় বলে অনেকে জানায়। শিশু সন্তানদের গোসল করানো সম্ভব হয় না। পিতামাতা গোসল শেষে সেই ভেজা কাপড় দিয়ে শিশু সন্তানদের দেহ মুছে দেন। এটাই সপ্তাহে একবার শিশু সন্তানদের গোসল। রাস্তাঘাটে ও ফুটপাতে নিম্নমানের ও নোংরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি স্বল্পমূল্যের খাবার খেয়ে বছরের পর বছর তারা কাটাচ্ছে। শিশু সন্তানগুলো নানা রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত। নারী-পুরুষদের মধ্যে শারীরিক অসুস্থতা লেগেই আছে। এ কারণে একজন কাজ করে পরিবারের অন্যরা বসে খায়। এমন ঘটনাও সেখানে নিত্যদিন ঘটছে। স্টেডিয়ামের আসরে অনেক দিনমজুর ও খেটে খাওয়া তরুণ-তরুণীর মধ্যে প্রেম হয়। পরে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। স্টেডিয়াম এলাকার দোকানপাটের মালামাল আনা-নেয়ার ভ্যানচালক ও শ্রমিকদের ৯০ ভাগ সেখানে থাকে। তবে তারা স্টেডিয়ামের মার্কেটের দোতলায় বারান্দায় রাতযাপন করে। নাইট গার্ড, দোকান মালিক ও কর্মচারীদের মতে, দুই স্টেডিয়ামের বারান্দা ও রাস্তায় প্রতি রাতে প্রায় ৩ হাজার ছিন্নমূল মানুষ রাত কাটায়।
সোহেল (২২) নামের এক তরুণ ভাঙা লোহা-লক্কড় টোকাইয়ের কাজ করে সারাদিন। সন্ধ্যায় পুরানা ঢাকায় এগুলো বিক্রি করে এক থেকে ৩শ’ টাকা পকেটে নিয়ে স্টেডিয়ামে ফিরে। প্রায় ১০ বছর স্টেডিয়ামে রাত কাটিয়ে আসছে। শিশু বয়সে তার বাবা মারা যায়। মা জায়েদা আক্তার ময়মনসিংহে খালার বাসায় অবস্থান করছে। তারা দুই ভাই। পরিবারের কারো সঙ্গে তার যোগাযোগ নেই। একটি গামছা বিছিয়ে সোহেল ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সাংবাদিক পরিচয় শুনে জীবনের দুঃখ-দুর্দশার কাহিনী তুলে ধরে। তার জন্ম বাড্ডা এলাকায় বলে সোহেল জানায়।
টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর এলাকার রিকশাচালক আব্দুর রফিকের ছেলে মাহরুফ (১৮) ছোট বেলা থেকে স্টেডিয়ামে থাকে। তার বাম পা ৫ বছর পূর্বে এক দুর্ঘটনায় কেটে ফেলা হয়। এরপর সে গুলিস্তান এলাকায় ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করে। আগে মাহরুফ টোকাইয়ের কাজ করতো। মাথায় একটি ইট দিয়ে ধুলাবালির মধ্যে স্টেডিয়ামের ফুটপাতে ঘুমায়। তার কোন বিছানাও নেই। ৩ ভাই ও দুই বোন। মাহরুফের সঙ্গে হয়তো বছরে তাদের সঙ্গে একবার দেখা হয়।
ময়মনসিংহ হালুয়াঘাট এলাকার মৃত হোসেল আলীর ছেলে আব্দুল আজিজ (২৫) ১৫ বছর স্টেডিয়ামে থাকছে। সে গুলিস্তান ফুটপাতে ভাঙা মোবাইল ফোনের পুরাতন যন্ত্রাংশ বিক্রি করে। পুলিশকে নিয়মিত চাঁদা না দেয়ায় তাকে ছিনতাইকারী বলে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। ৪ বছর জেল খাটার পর ৪ মাস আগে সে ছাড়া পায়। ২ ভাই ও এক বোন এবং মায়ের সঙ্গে বহু বছর ধরে দেখা হয় না। এখন কে, কোথায় আছে, তাও তার জানা নেই।
শাহনুর বেগম (৩৫), বাড়ি ভোলা জেলার ভেলুমার চর গ্রামে। হতদরিদ্র পরিবারে তার জন্ম। ১৫ বছর আগে বাঁচার তাগিদে লঞ্চযোগে ঢাকা চলে আসে। স্টেডিয়ামে এসে আশ্রয় নেয়। স্টেডিয়াম এলাকায় দিনমজুর হোসেন আলীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তার ছয় মেয়ে ও এক ছেলে। পুরনো জিনিসপত্র ও কাগজ টুকিয়ে তাদের বাঁচার সংগ্রাম নিত্যদিন। তবে এ অবস্থায়ও তারা ভাল আছেন বলে জানান।
বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার সোবহানপুর গ্রামের বাসিন্দা অতিদরিদ্র রফিকুল ইসলাম (৪৫) এক কাপড়ে বাঁচার জন্য ঢাকায় চলে আসে ১০ বছর আগে। স্টেডিয়ামে রাত কাটান। দিনে রাজধানীর রাস্তার মোড়ে মোড়ে ভিক্ষা করেন। তার বাম হাত নেই। গ্রামে দুই মেয়ে ও স্ত্রী আছে। আয়ের কিছু অংশ প্রতি মাসে পরিবারের জন্য পাঠান। এই দিয়ে স্ত্রী ও কন্যার কোন রকমে অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটছে। বেশ কয়েক বছর স্ত্রী- মেয়েদের সঙ্গে দেখা হয় না। মাঝে মধ্যে ফোনে কথা হয় বলে তিনি জানান।
বরিশাল কোতোয়ালি রুহাইয়া এলাকার দরিদ্র পরিবারের জন্ম নেয় কমলা বেগম (২৮) ১২ বছর আগে ঢাকায় চলে আসে। ছয় বছর আগে রিকশাচালক সিদ্দিকের সঙ্গে তাদের বিয়ে হয় স্টেডিয়াম এলাকায়। দুই মেয়ে ও এক শিশু ছেলে তাদের। স্বামী তিন মাস ধরে অসুস্থ। কোন কাজ করতে পারে না। কমলা ভিক্ষা করে কিংবা হোটেলে কাজ করে স্বামী ও সন্তানদের দু’মুঠো খাবার যোগান দিয়ে যাচ্ছে। স্টেডিয়ামে ছেঁড়া কাপড় বিছিয়ে স্বামী সন্তান নিয়ে রাত কাটায়।
সুব্রত কুমার ভৌমিক (৪০) স্টেডিয়ামে বেশ কয়েক বছর যাবত্ রাত কাটান। নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলায় তার বাড়ি। সুশিক্ষিত সুব্রত কুমার কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী। ১২ বছর আগে মুন্সিগঞ্জ শ্রীনগর উপজেলায় মুসলিম পরিবারের হালিমা আক্তার নামে এক তরুণীকে বিয়ে করে। পরে মুসলমান হয়ে যান। তার নাম রাখা হয় ইকবাল হোসেন শুভ। এই নিয়ে পিতা-মাতার সঙ্গে তার সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটে। বিয়ের কয়েক বছর পর তাদের মধ্যে দাম্পত্য বিরোধ বাধে। ঘটে বিচ্ছেদ। শুভর একটি শিশু সন্তান রয়েছে। তার নাম ইশাদ বলে শুভ জানান। দৈনিক তার ২০ টাকা হলে দিন কেটে যায়। নিরীহ দরিদ্র লোকের সঙ্গে তার থাকতে খুবই ভাল লাগে বলে জানান। মানসিক রোগে ভুগছেন শুভ।
ফরিদপুর ভাঙ্গা উপজেলার শাহ আলম (৪৫) ১৫ বছর যাবত্ স্টেডিয়াম এলাকায় থাকছে। নদীগর্ভে সব কিছুই বিলীন হয়ে যায় তার। বাঁচার তাগিদে সে ঢাকায় চলে আসে। পিতা-মাতা, ভাই বোন কোথায় তাও সে জানে না। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দিনমজুরের কাজ করে শাহ আলম। রাত কাটায় স্টেডিয়াম এলাকায়।
ময়মনসিংহ গৌরীপুর এলাকার হাসনা বেগম (৪৭) ১৪ বছর ধরে স্টেডিয়াম এলাকায় রাত কাটান। আগে গ্রামে জজ পাগলার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। ষড়যন্ত্র করে তাকে মেরে ফেলা হয়। এরপর হাসনা ঢাকায় চলে আসে। ৫ বছর আগে স্টেডিয়াম এলাকায় ভারতীয় নাগরিক জাহাঙ্গীরের সঙ্গে পরিচয় হয়। পরে তার সঙ্গে পল্টন কাজী অফিসে ৫০ হাজার টাকা দেনমোহরে বিয়ে হয়। এরপর তারা ভাড়া বাসায় দুই বছর বসবাস করে। তিন বছর যাবত্ স্বামী ভারতে চলে যাওয়ায় পুনরায় হাসনা স্টেডিয়ামে এসে আশ্রয় নেয়। তবে স্বামী হাসনার জন্য টাকা পাঠায়। সে টাকায় তিন বেলা খাবার খায় এবং রাত কাটায় স্টেডিয়ামে। দেড় বছরের একটি সন্তান রয়েছে। স্টেডিয়ামে থাকা তার জন্য নিরাপদ বলে হাসনা জানান।
হবিগঞ্জ জেলার বামইর এলাকার জামালউদ্দিন (৪৭) ১০ বছর ধরে স্টেডিয়ামে রাত যাপন করছে। সে দিনে পুরনো ঢাকায় ডেকোরেটরের কাজ করে। এই স্বল্প বেতনে বাসা ভাড়া দিয়ে থাকলে পরিবারের সদস্যরা না খেয়ে থাকবে। এ কারণে বিনা ভাড়ায় রাত কাটায় স্টেডিয়াম এলাকায়। ঐ টাকা বাড়িতে প্রতি মাসে পাঠিয়ে থাকে বলে জামালউদ্দিন জানান।
বরিশাল মুলাদি উপজেলার তরুণী পারভীন (২০) ছোট বেলায় ঢাকায় চলে আসে। স্টেডিয়াম এলাকায় টোকাইর কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। দুই বছর আগে স্টেডিয়ামে বসবাসরত রিকশা চালক সাইদুলের সঙ্গে পারভীনের বিয়ে হয়। স্বামী-স্ত্রী স্টেডিয়ামে রাত যাপন করে।
জামালপুরের ওমর হোসেন (১০), নীলফামারী জেলার সৈয়দপুরের শরীফুল (১৪) ও কিশোরগঞ্জের শহীদ (১০)সহ ১০ জন শিশু দুই পঙ্গু ব্যক্তির ঠেলাগাড়ি চালক ও হেলপার হিসাবে তিন বছর যাবত্ চাকরি করে আসছে। দুই পঙ্গু ভিক্ষা করে গুলিস্তান ও হাইকোর্ট এলাকায়। একজন পঙ্গু ভিক্ষুকের পিছনে পাঁচ শিশু কাজ করে। প্রতি শিশুর মাসিক বেতন এক হাজার টাকা ও খাওয়া পঙ্গু ভিক্ষকের উপর। এরা রাত কাটায় স্টেডিয়াম এলাকায়। এইভাবে চলছে তাদের জীবন।
ছিন্নমূল এইসব নারী-পুরুষ জানায়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কাজ শেষে রাতে তারা ছুটে আসে স্টেডিয়ামে। এখানে না আসলে তাদের ভাল লাগে না। এখানে বসবাসকারীরা একে অপরের দুঃখের সাথী। অসুস্থ হলে অন্যরা হাসপাতালে নিয়ে যায়। নানা সেবা যত্ন করে। যা তারা কোনদিন পরিবারের সদস্যদের থেকে পায়নি। স্টেডিয়াম এলাকার রাস্তা ও ফুটপাতে তাদের জীবনের সুখ-দুঃখের স্মৃতিগাঁথা।
