গত ২১ আগস্ট লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি দখল করে বিদ্রোহীরা। বেদখল হয় গাদ্দাফির রাজকীয় প্রাসাদ। এরপর গাদ্দাফির অবস্থান নিয়ে গুজব তার ইচ্ছেমতো ডালপালা মেলে। কেউ বলে, মাটির নিচে গাদ্দাফির অসংখ্য সুড়ঙ্গ, বাঙ্কার আছে।
হয়তো সেখানেই ঘাঁপটি মেরে আছেন তিনি। কেউ বলে তিনি আলজেরিয়ায় পালিয়ে গেছেন। কারো মতো
ভেনিজুয়েলায় আবার কেউ বলেন নাইজারে। কিন্তু সব গুজব ভ্রান্ত।
লিবিয়ার পতিত নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার তার জন্মশহর সির্তের কাছে বিদ্রোহীরা হামলা চালালে গাদ্দাফির অনুগত বাহিনী তুমুল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তারা বিদ্রোহীদের সঙ্গে গোলাগুলিতে লিপ্ত হয়। গাদ্দাফির শরীরে এসময় গুলি লাগে। বিদ্রোহীদের সহায়তায় পশ্চিমা ন্যাটো বাহিনীও যুদ্ধবিমান নিয়ে এগিয়ে আসে। গাদ্দাফির যোদ্ধারা বিপদ বুঝে নেতাকে নিয়ে নিরাপদ স্থানে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করে। কিন্তু গাদ্দাফির পলায়নরত গাড়িবহরে বিমান হামলা চালায় ন্যাটো। এতে আরো গুরুতর আহত হন গাদ্দাফি। এ অবস্থাতেই ধরা পড়েন তিনি। কিন্তু তার চিকিত্সার পরিবর্তে বিদ্রোহীরা উলাসে ব্যস্ত থাকায় একসময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। অবসান হয় লিবিয়ার লৌহমানবের ৪২ বছরের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের।
গাদ্দাফির মৃত্যু নিয়ে সব মহল প্রথমে সংশয় প্রকাশ করলেও ধীরে ধীরে এই বিশ্বাস জন্মাতে থাকে যে সত্যিই নিহত হয়েছেন তিনি। সব সংশয় দূর করতে গতকাল সন্ধ্যায় লিবিয়ার অন্তবর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ জিবরিল গাদ্দাফির নিহত হবার খবর নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেছেন, গাদ্দাফি আর বেঁচে নেই, এটাই চরম বাস্তবতা। এই দিনটার জন্যই দীর্ঘদিন ধরে তারা অপেক্ষা করছিলেন বলে জানান।
লিবিয়ার সাবেক নেতা নিহত হবার খবরে উলাস প্রকাশ করেছে লিবিয়ার গাদ্দাফি বিরোধীরা। তারা গাদ্দাফির ধরা পড়ার ও নিহত হবার খবর শুনে দলে দলে রাস্তায় নেমে এসে উলাস প্রকাশ করে। রাস্তাঘাট ছেয়ে যায় লিবিয়ার জাতীয় পতাকায়। লোকজন গাড়ির হর্ন বাজিয়ে জানালা দিয়ে পতাকা উড়াতে উড়াতে আনন্দ প্রকাশ করে।
অন্যদিকে, বিশ্ব নেতারাও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন গাদ্দাফি অধ্যায়ের যবনিকা হয়েছে শুনে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বলেছেন, সত্যিই যদি গাদ্দাফি নিহত হয়ে থাকেন সেটা গোটা বিশ্বের জন্য অবশ্যই একটি ভাল খবর। আনন্দ প্রকাশ করেছে ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়স, রাশিয়াসহ অনেক দেশ। তারা মনে করছেন গাদ্দাফি নিহত হওয়ায় এখন বিদ্রোহী কাউন্সিল নিশ্চিন্ত মনে দেশের শাসনকাজ চালাতে পারবে।
গত ২১ আগস্ট লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি দখল করে বিদ্রোহীরা। বেদখল হয় গাদ্দাফির সুরম্য রাজকীয় প্রাসাদ। এরপর গাদ্দাফির অবস্থান নিয়ে গুজব তার ইচ্ছেমতো ডালপালা মেলে। কেউ বলে, মাটির নিচে গাদ্দাফির অসংখ্য সুড়ঙ্গ, বাঙ্কার আছে। হয়তো সেখানেই ঘাঁপটি মেরে আছেন তিনি। কেউ বলে তিনি আলজেরিয়ায় পালিয়ে গেছেন। কারো মতো ভেনিজুয়েলায় আবার কেউ বলেন নাইজারে। কিন্তু সব গুজব ভ্রান্ত প্রমাণ করে বিদ্রোহীদের হাতে নিজ জন্মশহরে আহত অবস্থায় ধরা পড়ার পর মৃত্যু হয়েছে তার।
গাদ্দাফি অধ্যায় শেষ : বিদ্রোহীদের দাবির পরেও গতকাল কোনো সংবাদমাধ্যমই গাদ্দাফির মৃত্যুর খবর প্রচার করার দায়িত্ব নিতে চায়নি। কারণ, বেশিরভাগ মানুষের কাছেই অবিশ্বাস্য ঠেকছিল গাদ্দাফির মৃত্যুর খবরটি। কেউ মনে করেন বিদ্রোহীদের মানসিকভাবে দুর্বল করার জন্য এটা হতে পারে ‘চালবাজি’। কারো মতে এটা মার্কিন ফন্দি। কিন্তু সব সংশয়ের অবসান ঘটান লিবিয়ার অন্তবর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ জিবরিল। তিনি গতকাল সন্ধ্যায় এক সংবাদ সংম্মেলন করেই ঘোষণা দেন- দায়িত্ব নিয়েই বলছি গাদ্দাফি আর বেঁচে নেই। তার উভয় পায়ে এবং মাথায় গুলি লেগেছে। শিগগিরই তার মৃতুদেহ মিসরাতায় নিয়ে যাওয়া হবে। সবাইকে দেখানো হবে। অপরদিকে, তথ্যমন্ত্রী মাহমুদ সাম্মান বলেন, যারা মৃতদেহ দেখেছেন তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাদের মিথ্যা বলার মতো কোনো কারণ দেখছি না। প্রধানমন্ত্রী শতভাগ নিশ্চিত করে ঘোষণা দিচ্ছেন যে গাদ্দাফি নিহত হয়েছেন। লিবিয়ার প্রধানমন্ত্রী এবং তথ্যমন্ত্রীর ঘোষণার পরই সব বিশ্ববাসীর মন থেকে প্রশ্নবোধক চিহ্ন উঠে যায়।
যেভাবে গাদ্দাফি ধরা পড়েন : বিদ্রোহীদের একজন নেতা জানান, বৃহস্পতিবার খুব ভোরে সির্তের কাছ থেকে গাদ্দাফিকে বন্দি করা হয়। গাড়ি বহর নিয়ে পালানোর চেষ্টার সময় ন্যাটো বিমান হামলার শিকার হন গাদ্দাফি। তার দুই পায়ে আঘাত লাগে। লিবিয়ার সাবেক এ শাসককে বন্দি করার সময় তার সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আবু বকর নিহত হন। গাদ্দাফিবিরোধী এক যোদ্ধা জানান, আহত অবস্থায় গাদ্দাফি কোনোরকমে মাটিতে নেমে কাছে থাকা একটি পাস্টিকের পাইপের গর্তে ঢুকে যান। সেখান থেকেই তাকে টেনে বের করে বিদ্রোহীরা। দুই যোদ্ধা যখন তাকে গর্ত থেকে টেনে বের করতে যায় তখন গাদ্দাফি করুণ আর্তি জানিয়ে বলতে থাকেন, ‘দয়া করো গুলি করো না, গুলি করো না’।
গাদ্দাফির রক্তাক্ত মৃতদেহের ছবি বিভিন্ন আন্তজার্তিক পত্রিকা এবং টিভিতে দেখানো হয়। গুলিতে নিহত গাদ্দাফির মরদেহ নিরাপত্তার কারণে প্রথমে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। টিভিতে দেখা যায়, গুলিতে গাদ্দাফির নাক মুখ ঝাঁঝরা হয়ে গেছে।
এদিকে গতকাল দিন এবং রাতভর লিবিয়াতে শোনা গেছে বন্দুকের ফাঁকা গুলির শব্দ। নারী পুরুষ শিশুরা দলে দলে রাস্তায় নেমে উলাস প্রকাশ করছে। তাদের মুখে সমবেত শোগান -‘আলাহু আকবর, লিবিয়া দীর্ঘজীবি হোক’।