জীবনের শেষ দিনগুলোতে সির্ত শহরের একস্থান থেকে অন্য স্থানে পালিয়ে বেড়ান লিবীয় নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি। চোখের সামনেই তাঁর শাসনব্যবস্থা ধূলিসাত্ হয়ে যাওয়ায় তিনি ছিলেন ক্ষুব্ধ ও বিষণ্ন। গাদ্দাফির একসময়ের প্রধান দেহরক্ষীর দায়িত্ব পালনকারী মানসুর দাও এ কথা বলেছেন।
দি ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, গাদ্দাফির নিজ গোত্রের সন্তান মানসুর। তিনি বর্তমানে মিসরাতার একটি কারাগারে।
২০ অক্টোবর ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এনটিসি) যোদ্ধাদের হাতে গাদ্দাফি আটক এবং নিহত হওয়ার সময় তাঁর অনুগত যেসব যোদ্ধাকে জীবিত অবস্থায় আটক করা হয়, তাঁদের একজন মানসুর। তিনি বলেছেন, যুদ্ধের শেষের দিকে গাদ্দাফি, তাঁর ছেলে মুতাসিম এবং ঘনিষ্ঠ অন্যরা বিভিন্ন সময়ে সির্ত শহরের কয়েকটি পরিত্যক্ত বাড়িতে অবস্থান করেন। এ সময় বাইরের জগত্ থেকে তাঁরা ছিলেন একেবারে বিচ্ছিন্ন। ওই পরিত্যক্ত বাড়িগুলোতে ছিল না কোনো টেলিভিশন, ফোন বা কোনো বিদ্যুত্সংযোগ। রাতের অন্ধকারে তাঁদের আলোর একমাত্র উত্স ছিল মোমবাতি।
মানসুর জানান, শেষ দিনগুলোতে গাদ্দাফি বই পড়তেন, বিভিন্ন ঘটনা নোট করে রাখতেন, কখনো কখনো কয়লার স্টোভে চা বানিয়ে সময় কাটাতেন। তিনি যুদ্ধ পরিচালনা করতেন না। সেটা করতেন তাঁর ছেলেরা। তিনি কোনো পরিকল্পনা করতেন না, এমনকি কোনো পরিকল্পনা নিয়েও ভাবতেন না।
মানসুর বলেন, রাজধানী ত্রিপোলিতে বিদ্রোহী যোদ্ধারা ঢুকে পড়ার আগেই ১৮ বা ১৯ আগস্ট গাদ্দাফি বাব আল আজিজিয়া কম্পাউন্ড ছেড়ে পালান। রাজধানীর পতনের পর তিনি সরাসরি সির্ত শহরের উদ্দেশে রওনা হন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন মুতাসিম। আর সাইফ আল-ইসলাম বনি ওয়ালিদে চলে যান। এক সপ্তাহ পর মানসুর সির্ত শহরে গাদ্দাফির সঙ্গে মিলিত হন। গাদ্দাফির গোয়েন্দা প্রধান আবদুল্লাহ আল-সেনুসি তখন সির্ত আর সাবা শহরে যাওয়া-আসা করছিলেন। এনটিসি যোদ্ধাদের হাতে আটক হওয়ার পর তাঁর নেতার (গাদ্দাফির) ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা তিনি বলতে পারেন না।
মানসুর জানান, গাদ্দাফিকে তাঁর সহযোগীরা দেশ ছাড়তে অনুরোধ করেছিলেন। তবে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, পূর্বপুরুষের মাটিতেই তিনি মৃত্যুবরণ করতে চান।
মানসুর বলেন, ‘তাঁর জন্য আমার দুঃখ হয়। কারণ তিনি পরিস্থিতিকে অবজ্ঞা করেছেন। তিনি দেশ ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়ে শান্তিতে জীবনযাপন করতে পারতেন।’
মানসুর দাও ১৯৮০ সাল থেকেই গাদ্দাফি বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। নব্বইয়ের দশকে তিনি গাদ্দাফির ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীদের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি কথিত ‘পিপলস গার্ড’-এর কমান্ডার ছিলেন। গাদ্দাফিবিরোধীদের খুঁজে বের করাই ছিল ওই বাহিনীর কাজ।
শেষ সময়ে গাদ্দাফি বই পড়তেন, চা বানাতেন
মরুভূমির গোপন স্থানে গাদ্দাফিকে দাফন
লিবিয়ার সাবেক নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি, তাঁর ছেলে মুতাসিম এবং এক সাবেক সহযোগীকে আজ মঙ্গলবার একটি মরুভূমির গোপন কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এনটিসি) সূত্রের বরাত দিয়ে আল জাজিরা টেলিভিশনের অনলাইনে এ খবর প্রকাশ করা হয়েছে।
এদিকে মিসরাতায় এনটিসির সেনা সূত্র জানিয়েছে, দাফনের উদ্দেশ্যে মাংস রাখার হিমঘর থেকে গাদ্দাফি ও তাঁর ছেলে মুতাসিমের মরদেহ গতকাল সোমবার রাতে সরিয়ে নেওয়া হয়।
নাম প্রকাশ না করে গতকাল সোমবার এনটিসির এক কর্মকর্তা জানান, গাদ্দাফিকে আজ মরুভূমির অজানা একটি স্থানে সাধারণভাবে সমাহিত করা হবে। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, মরদেহের এমন অবস্থা হয়েছে যে তা আর রাখা সম্ভব নয়।
কয়েক দিন আগে এনটিসির এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, গাদ্দাফির দাফনের সময় মাত্র চারজন প্রত্যক্ষদর্শী থাকবে। দাফনের স্থানের নাম প্রকাশ না করার ব্যাপারে এই প্রত্যক্ষদর্শীরা কোরআন ছুঁয়ে শপথ করবেন।
গাদ্দাফির সবচেয়ে আলোচিত ছেলে সাইফ ইসলাম এনটিসির হাতে আহত অবস্থায় আটক রয়েছেন বলে এত দিন বলা হচ্ছিল। তবে এখন বলা হচ্ছে, তিনি নাইজার ও আলজেরিয়ার সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করছেন।
গত বৃহস্পতিবার জন্মস্থান সিরত শহরে জাতীয় অন্তর্বর্তী পরিষদের (এনটিসি) যোদ্ধাদের হাতে আটক হন গাদ্দাফি, তাঁর ছেলে মুতাসিম ও সাবেক সেনাপ্রধান। এরপর তাঁদের হত্যা করা হয়। গতকাল সোমবার পর্যন্ত মিসরাতা শহরের কাঁচাবাজারের একটি হিমঘরে তাঁদের লাশ পড়ে ছিল।
জাতিসংঘ তদন্ত চেয়েছে ॥ গাদ্দাফির মৃত্যুর কারণ নির্ণয়
০ ন্যাটোর অভিযান শেষ হওয়ার ঘোষণা যে কোন সময়
০ লিবীয় নেতার রক্তাক্ত মরদেহ হিমঘরে
০ দাফন নিয়ে রহস্য
০ সাগরে সমাহিত করা হতে পারে
লড়াইয়ের ময়দানে জীবিত ধরার পর লিবিয়ার সাবেক স্বৈরশাসককে কিভাবে হত্যা করা হলো এ প্রশ্ন ধীরে ধীরে জোরালো হয়ে উঠছে। এ নিয়ে রীতিমতো বেকায়দায় এখন লিবিয়ার জাতীয় অন্তর্বর্তী পরিষদের (এনটিসি) কর্তা ব্যক্তিরা। ধরার পর সাবেক লিবীয় নেতা গাদ্দাফির ওপর নির্যাতনের ভিডিও চিত্র প্রকাশ হওয়ার পর রীতিমতো চাপের মুখে এখন লিবিয়ার প্রশাসনযন্ত্র। জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা ঐ ভিডিও চিত্রের বরাত দিয়ে গাদ্দাফির মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সংস্থাটি গাদ্দাফির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করার আহ্বান জানিয়ে বলেছে, গ্রেফতারের পর গাদ্দাফিকে নিয়ে ঐ ভিডিও চিত্রটি খুবই অস্বস্তিকর ও বিচলিত হওয়ার মতো। জাতিসংঘ বলছে, গাদ্দাফির ৪২ বছরের শাসনামল নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও কাউকে বিনা বিচারে হত্যা করা যায় না। তবে এনটিসি এরই মধ্যে সাবেক এই লিবীয় নেতার মৃতু্যর কারণ হিসেবে ক্রসফায়ারের গল্প সাজিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে। গাদ্দাফির মৃত্যুর বিষয়টি জাতিকে অবহিত করার জন্য জাতির উদ্দেশে বৃহস্পতিবার রাতে এনটিসি প্রধানের ভাষণ দেয়ার কথা থাকলেও পরে অজানা কারণে তা আর করা হয়নি। মৃত্যুর একদিন পর গাদ্দাফির লাশ কিভাবে দাফন করা হবে সে বিষয়টি সুরাহা করতে পারেনি এনটিসি। ‘কিং অব কিংস অব আফ্রিকা’ হিসেবে পরিচিত এই বীরের লাশ রাখার জায়গা খুঁজে পেতে এখন গলদঘর্ম অবস্থা তাদের। ইসলামী রীতি অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গাদ্দাফির লাশ দাফন করার কথা উঠলেও ঐ অবস্থান থেকে এনটিসি সরে এসেছে। ত্রিপোলিতে বিবিসি’র প্রতিনিধি ক্যারোলিন হাওলে বলেছেন, কর্নেল গাদ্দাফির মৃত্যু পরিস্থিতি এবং বিশেষ করে তাঁর লাশ দাফন কিভাবে করা হবে সে ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে এনটিসি নীতি নির্ধারকদের। গোপনে গাদ্দাফির লাশ দাফন নিয়েও জোর আলাপ আলোচনা চলছে। আজানা আতঙ্কে গাদ্দাফির লাশ ওসামা বিন লাদেনের মতো সাগরে ভাসিয়ে দেয়ার বিষয়টিও আলোচনার সামনে চলে এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে, জীবিত গাদ্দাফির চেয়ে মৃত গাদ্দাফি কি অনেক বেশি শক্তিশালী? লিবিয়া তো বটেই বিশ্বজুড়ে আলোচনার শীর্ষে এখন যে কথাটি তা হচ্ছে_ গাদ্দাফি কথা রেখেছেন। তিনি বলেছিলেন, আমি লিবিয়া ছেড়ে পালাব না, মরলে বীরের মতোই মরব, লিবিয়ার মাটিতেই মরব। এদিকে ন্যাটো জানিয়েছে, লিবিয়ায় তাদের অভিযান শেষ হওয়ার পথে। ফরাসী প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সার্কোজি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, কর্নেল গাদ্দাফির মৃতু্যর মধ্যদিয়ে লিবিয়ায় ন্যাটোর সামরিক অভিযান শেষ হয়ে গেছে। আমরা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি অপারেশন সম্পন্ন। শুক্রবারই ন্যাটো এ ব্যাপারে একটি সিদ্ধানত্ম নিতে পারে বলে এনটিসির এক কর্মকর্তা আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন। সিরতে নিহত হওয়ার পর গাদ্দাফির রক্তাক্ত মরদেহ এখন মিসরাতার একটি হিমঘরে জনসাধারণের জন্য রাখা হয়েছে। খবর বিবিসি, আল-জাজিরা ও এএফপি’র।
লিবিয়ার তেলমন্ত্রী আলী তারহোনি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, কয়েক দিনের মধ্যে কর্নেল গাদ্দাফির লাশ ইসলামী রীতি অনুযায়ী দাফন করা হবে। তাঁর লাশ মিসরাতায় রাখা আছে। সবাইকে আমরা নিশ্চিত করতে চাই, গাদ্দাফি মারা গেছেন এবং এ জন্যই কয়েকদিন তাঁর লাশ মিসরাতায় হিমাগারে রাখার সিদ্ধানত্ম নিয়েছি। কিভাবে লাশ দাফন করা হবে এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধানত্ম এখনও নেয়া হয়নি। তবে এনটিসির কোর কমিটির কয়েকজন সদস্যের বরাত দিয়ে রয়টার্সের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, গাদ্দাফির লাশ কি করা হবে তা নিয়ে এনটিসি কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না। গ্রেফতার করার পর গাদ্দাফিকে ঘিরে আসলে কি ঘটেছিল তা নিয়ে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। এনটিসির সিনিয়র সদস্য মোহাম্মদ সায়েহ বিবিসিকে বলেছেন, কর্নেল মারা গেছে, যদি বলি তাঁকে ইচ্ছাকৃতভাবে মারা হয়েছে তাহলে আমি বলব তিনি এটা প্রাপ্য ছিলেন। এনটিসির ঐ কর্মকর্তা বলেন, যদি তাঁকে হাজারবার হত্যা করা হতো, আমার মনে হয় তাহলেও তিনি অতীতে যা করেছেন তাঁর শোধ হয় না। তবে শুক্রবার মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘ হাইকমিশনার বলেছেন, কিভাবে গাদ্দাফি মারা গেলেন তা উদঘাটনে তদন্ত হওয়া দরকার। কমিশনের মুখপাত্র রুপার্ট কলভিলে বলেছেন, মোবাইল ভিডিও চিত্রে দেখা যাচ্ছে, গ্রেফতারের পর গাদ্দাফি জীবিত ছিলেন এবং পরে তিনি মারা যান এবং মোবাইলের ভিডিও চিত্রকে অস্বস্তিকর ও বিচলিত হওয়ার মতো বিষয় বলে মনে করছেন। ব্রিটিশভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল কর্নেল গাদ্দাফির মৃত্যুর কারণ উদঘাটনে নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে তদন্ত করার আহ্বান জানিয়েছে। এ সবের জবাবে এনটিসির সিনিয়র সদস্য মোহাম্মাদ সায়ে বলেছেন, গাদ্দাফির মৃত্যুর বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য তৃতীয় কোন পক্ষ লিবিয়ায় আসবে। তিনি বলেছেন, ইসলামী রীতি মেনে যথাযোগ্য মর্যাদায় আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া গাদ্দাফিকে দাফন করা হবে। এদিকে গাদ্দাফির আহত পুত্র সাইফ আল ইসলাম এনটিসির যোদ্ধাদের হাত থেকে পালিয়ে গেছেন বলে বিসিসির এক খবরে বলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। তবে এর সত্যতা যাচাই করা যায়নি। তাঁর ভাই মুতাস্মিম লড়াইয়ের ময়দানে বৃহস্পতিবার প্রাণ হারান।
আল-জাজিরা টেলিভিশনের খবরে বলা হয়েছে, লিবিয়ার সাবেক স্বৈরশাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির মৃতদেহ মিসরাতা শহরের একটি মসজিদে নেয়া হয়েছে। আল-আরাবিয়া টেলিভিশনও বলেছে, গাদ্দাফির মৃতদেহ মিসরাতায়। তবে তারা জানায়, লাশ রাখা হয়েছে শহরের বাণিজ্যিক এলাকা সোক তাওয়ানসায়। এর আগে লিবিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের (ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিল-এনটিসি) এক কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার নিরাপত্তার কারণে গোপন এক জায়গায় গাদ্দাফির মৃতদেহ স্থানানত্মরের কথা জানান। মিসরাতা শহরে এনটিসি কর্মকর্তা মোহাম্মেদ আব্দুল কাফি বলেন, গাদ্দাফির লাশ আমাদের ইউনিটের একটি গাড়িতে রয়েছে এবং নিরাপত্তার কারণে আমরা তা গোপন একটি স্থানে নিয়ে যাচ্ছি।
এনটিসির উর্ধতন সামরিক কর্মকর্তা আব্দেল মজিদ রয়টার্সকে বলেন, পায়ের পাশাপাশি তাঁর (গাদ্দাফির) মাথায়ও আঘাত লাগে। গাদ্দাফির গ্রুপের সেনাদের ওপর ব্যাপক গুলি চালানো হয় এবং তিনি মারা যান। তবে মজিদের এ দাবির পক্ষে নিরপেক্ষ কোন তথ্য জানা যায়নি।
গাদ্দাফি নিহত
গত ২১ আগস্ট লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি দখল করে বিদ্রোহীরা। বেদখল হয় গাদ্দাফির রাজকীয় প্রাসাদ। এরপর গাদ্দাফির অবস্থান নিয়ে গুজব তার ইচ্ছেমতো ডালপালা মেলে। কেউ বলে, মাটির নিচে গাদ্দাফির অসংখ্য সুড়ঙ্গ, বাঙ্কার আছে।
হয়তো সেখানেই ঘাঁপটি মেরে আছেন তিনি। কেউ বলে তিনি আলজেরিয়ায় পালিয়ে গেছেন। কারো মতো
ভেনিজুয়েলায় আবার কেউ বলেন নাইজারে। কিন্তু সব গুজব ভ্রান্ত।
লিবিয়ার পতিত নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার তার জন্মশহর সির্তের কাছে বিদ্রোহীরা হামলা চালালে গাদ্দাফির অনুগত বাহিনী তুমুল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তারা বিদ্রোহীদের সঙ্গে গোলাগুলিতে লিপ্ত হয়। গাদ্দাফির শরীরে এসময় গুলি লাগে। বিদ্রোহীদের সহায়তায় পশ্চিমা ন্যাটো বাহিনীও যুদ্ধবিমান নিয়ে এগিয়ে আসে। গাদ্দাফির যোদ্ধারা বিপদ বুঝে নেতাকে নিয়ে নিরাপদ স্থানে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করে। কিন্তু গাদ্দাফির পলায়নরত গাড়িবহরে বিমান হামলা চালায় ন্যাটো। এতে আরো গুরুতর আহত হন গাদ্দাফি। এ অবস্থাতেই ধরা পড়েন তিনি। কিন্তু তার চিকিত্সার পরিবর্তে বিদ্রোহীরা উলাসে ব্যস্ত থাকায় একসময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। অবসান হয় লিবিয়ার লৌহমানবের ৪২ বছরের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের।
গাদ্দাফির মৃত্যু নিয়ে সব মহল প্রথমে সংশয় প্রকাশ করলেও ধীরে ধীরে এই বিশ্বাস জন্মাতে থাকে যে সত্যিই নিহত হয়েছেন তিনি। সব সংশয় দূর করতে গতকাল সন্ধ্যায় লিবিয়ার অন্তবর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ জিবরিল গাদ্দাফির নিহত হবার খবর নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেছেন, গাদ্দাফি আর বেঁচে নেই, এটাই চরম বাস্তবতা। এই দিনটার জন্যই দীর্ঘদিন ধরে তারা অপেক্ষা করছিলেন বলে জানান।
লিবিয়ার সাবেক নেতা নিহত হবার খবরে উলাস প্রকাশ করেছে লিবিয়ার গাদ্দাফি বিরোধীরা। তারা গাদ্দাফির ধরা পড়ার ও নিহত হবার খবর শুনে দলে দলে রাস্তায় নেমে এসে উলাস প্রকাশ করে। রাস্তাঘাট ছেয়ে যায় লিবিয়ার জাতীয় পতাকায়। লোকজন গাড়ির হর্ন বাজিয়ে জানালা দিয়ে পতাকা উড়াতে উড়াতে আনন্দ প্রকাশ করে।
অন্যদিকে, বিশ্ব নেতারাও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন গাদ্দাফি অধ্যায়ের যবনিকা হয়েছে শুনে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বলেছেন, সত্যিই যদি গাদ্দাফি নিহত হয়ে থাকেন সেটা গোটা বিশ্বের জন্য অবশ্যই একটি ভাল খবর। আনন্দ প্রকাশ করেছে ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়স, রাশিয়াসহ অনেক দেশ। তারা মনে করছেন গাদ্দাফি নিহত হওয়ায় এখন বিদ্রোহী কাউন্সিল নিশ্চিন্ত মনে দেশের শাসনকাজ চালাতে পারবে।
গত ২১ আগস্ট লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি দখল করে বিদ্রোহীরা। বেদখল হয় গাদ্দাফির সুরম্য রাজকীয় প্রাসাদ। এরপর গাদ্দাফির অবস্থান নিয়ে গুজব তার ইচ্ছেমতো ডালপালা মেলে। কেউ বলে, মাটির নিচে গাদ্দাফির অসংখ্য সুড়ঙ্গ, বাঙ্কার আছে। হয়তো সেখানেই ঘাঁপটি মেরে আছেন তিনি। কেউ বলে তিনি আলজেরিয়ায় পালিয়ে গেছেন। কারো মতো ভেনিজুয়েলায় আবার কেউ বলেন নাইজারে। কিন্তু সব গুজব ভ্রান্ত প্রমাণ করে বিদ্রোহীদের হাতে নিজ জন্মশহরে আহত অবস্থায় ধরা পড়ার পর মৃত্যু হয়েছে তার।
গাদ্দাফি অধ্যায় শেষ : বিদ্রোহীদের দাবির পরেও গতকাল কোনো সংবাদমাধ্যমই গাদ্দাফির মৃত্যুর খবর প্রচার করার দায়িত্ব নিতে চায়নি। কারণ, বেশিরভাগ মানুষের কাছেই অবিশ্বাস্য ঠেকছিল গাদ্দাফির মৃত্যুর খবরটি। কেউ মনে করেন বিদ্রোহীদের মানসিকভাবে দুর্বল করার জন্য এটা হতে পারে ‘চালবাজি’। কারো মতে এটা মার্কিন ফন্দি। কিন্তু সব সংশয়ের অবসান ঘটান লিবিয়ার অন্তবর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ জিবরিল। তিনি গতকাল সন্ধ্যায় এক সংবাদ সংম্মেলন করেই ঘোষণা দেন- দায়িত্ব নিয়েই বলছি গাদ্দাফি আর বেঁচে নেই। তার উভয় পায়ে এবং মাথায় গুলি লেগেছে। শিগগিরই তার মৃতুদেহ মিসরাতায় নিয়ে যাওয়া হবে। সবাইকে দেখানো হবে। অপরদিকে, তথ্যমন্ত্রী মাহমুদ সাম্মান বলেন, যারা মৃতদেহ দেখেছেন তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাদের মিথ্যা বলার মতো কোনো কারণ দেখছি না। প্রধানমন্ত্রী শতভাগ নিশ্চিত করে ঘোষণা দিচ্ছেন যে গাদ্দাফি নিহত হয়েছেন। লিবিয়ার প্রধানমন্ত্রী এবং তথ্যমন্ত্রীর ঘোষণার পরই সব বিশ্ববাসীর মন থেকে প্রশ্নবোধক চিহ্ন উঠে যায়।
যেভাবে গাদ্দাফি ধরা পড়েন : বিদ্রোহীদের একজন নেতা জানান, বৃহস্পতিবার খুব ভোরে সির্তের কাছ থেকে গাদ্দাফিকে বন্দি করা হয়। গাড়ি বহর নিয়ে পালানোর চেষ্টার সময় ন্যাটো বিমান হামলার শিকার হন গাদ্দাফি। তার দুই পায়ে আঘাত লাগে। লিবিয়ার সাবেক এ শাসককে বন্দি করার সময় তার সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আবু বকর নিহত হন। গাদ্দাফিবিরোধী এক যোদ্ধা জানান, আহত অবস্থায় গাদ্দাফি কোনোরকমে মাটিতে নেমে কাছে থাকা একটি পাস্টিকের পাইপের গর্তে ঢুকে যান। সেখান থেকেই তাকে টেনে বের করে বিদ্রোহীরা। দুই যোদ্ধা যখন তাকে গর্ত থেকে টেনে বের করতে যায় তখন গাদ্দাফি করুণ আর্তি জানিয়ে বলতে থাকেন, ‘দয়া করো গুলি করো না, গুলি করো না’।
গাদ্দাফির রক্তাক্ত মৃতদেহের ছবি বিভিন্ন আন্তজার্তিক পত্রিকা এবং টিভিতে দেখানো হয়। গুলিতে নিহত গাদ্দাফির মরদেহ নিরাপত্তার কারণে প্রথমে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। টিভিতে দেখা যায়, গুলিতে গাদ্দাফির নাক মুখ ঝাঁঝরা হয়ে গেছে।
এদিকে গতকাল দিন এবং রাতভর লিবিয়াতে শোনা গেছে বন্দুকের ফাঁকা গুলির শব্দ। নারী পুরুষ শিশুরা দলে দলে রাস্তায় নেমে উলাস প্রকাশ করছে। তাদের মুখে সমবেত শোগান -‘আলাহু আকবর, লিবিয়া দীর্ঘজীবি হোক’।
আবেদনকারীরা কাজের সুযোগ পাচ্ছেন মালয়েশিয়ায়
মালয়েশিয়া সরকারের কাছে ক্ষমা চেয়ে আবেদন করা প্রায় ১০ লাখ অবৈধ অভিবাসী নির্দিষ্ট কিছু কাজের সুযোগ পাবেন। এখন থেকে পাম তেল চাষাবাদ বা নির্মাণ খাতের মতো যেসব জায়গায় মালয়েশিয়ারা কাজ করতে চান না, সেসব খাতে তাঁরা কাজ করতে পারবেন।
বিবিসির খবরে বলা হয়, মালয়েশিয়া সরকার আবেদনকারী অবৈধ শ্রমিকদের বৈধতা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এতে সবচেয়ে উপকৃত হবেন ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ ও ফিলিপাইন থেকে ওই দেশে যাওয়া শ্রমিকেরা।
কুয়ালালামপুরে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এ কে এম আতিকুর রহমান বিবিসিকে বলেন, মালয়েশিয়া সরকারের এই বৈধতা কর্মসূচির প্রথম স্তর হচ্ছে নাম নিবন্ধন করা। যাঁরা অবৈধ কর্মী, তাঁরা ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে নিবন্ধন করছেন। বিভিন্ন খাতে পর্যায়ক্রমে তাঁদের বৈধতা দেওয়া হবে। আর যাঁরা বৈধ আছেন, তাঁদেরও নিবন্ধন করতে হবে। রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘এই ঘোষণায় নতুন কোনো বাংলাদেশির মালয়েশিয়ায় আসার সুযোগ আপাতত নেই। আগে এই প্রক্রিয়াটি শেষ হোক। তারপর আমরা দেখছি, কদ্দুর কী করা যায়।’
চার বছরের পণ্য আগাম ঠিক করে গেছেন স্টিভ জবস
সদ্যই পৃথিবী ছেড়ে গেছেন ‘শিল্পী মন আর ইঞ্জিনিয়ার মসত্মিষ্ক’ স্টিভ জবস। কিন্তু মৃতু্যর আগেই তাঁর প্রতিষ্ঠান এ্যাপলের ভবিতব্য তিনি ঠিক করে গেছেন। আগামী ৪ বছর নতুন পণ্যের জন্য এ্যাপলকে যেন সংশয়ে ভুগতে না হয় সে ব্যবস্থা করে গেছেন তিনি।
আইপড, আইপ্যাড, আইফোন এবং ম্যাকবুকসহ নতুন অনেক পণ্যেরই নকশা চূড়ান্ত করে গেছেন স্টিভ। খবর ডেইলি মেইল অনলাইনের।
‘স্পেসশিপ’ আকারের এ্যাপলের নতুন হেডকোয়ার্টার তৈরির পরিকল্পনা ছিল তাঁর। সে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চলতি বছরের জুন মাসেই তিনি অনুমতি দিয়ে গেছেন। এ্যাপল সূত্রে বলা হয়েছে, জবস জানতেন, তাঁর সময় ফুরিয়ে আসছে, তাই তিনি পুরো এক বছর প্রচুর পরিশ্রম করেন। সে সময়ে তিনি এ্যাপলের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা পণ্যগুলোর জন্য কাজ করেছেন।
এ্যাপলের পাইপলাইনে চার বছরের পণ্য স্টিভ নিজেই নকশা করে গেছেন। শেষদিকে তিনি ধরেছিলেন আইক্লাউডের কাজও। বিশেস্নষজ্ঞরা বলছেন, স্টিভের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ভার এখন এ্যাপলের বর্তমান সিইও টিম কুকের ওপর।
তাঁর সহযোগী হিসেবে আছেন জনি আইভ, ফিল শিলারসহ সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে মোট নয় জন।
মিসর আবারো বিদ্রোহের ইঙ্গিত!
সবজি হিসাবে টমেটো মিসরে অত্যন্ত জনপ্রিয়। বহু মিসরীয় নাগরিকের প্রতিদিনকার খাদ্য তালিকায় টমেটো দিয়ে তৈরি কোন না কোন পদ থাকবেই। প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের পতনের পর গত সাত মাসে টমেটোর দাম দ্বিগুণ হয়েছে। গত জুন মাসে চাল ও চিনির দাম যা ছিল মাত্র ৩০ দিনের ব্যবধানে জুলাইতে এসে দুটি পণ্যের দামই শতকরা দশ ভাগ বেড়েছে। নিত্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য খাদ্য পণ্যের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
মিশরীয় লেখক ইয়াসমিন রাশিদি সেদেশের জনদুর্ভোগের চিত্রকে বর্ণনা করেছেন, জীবন এখন অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিলে মিশরে আসলে কোন পরিবর্তন হয়নি। আর যদি কিছু হয়ে থাকে তা হচ্ছে, সব কিছুই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিন দিন খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ছে। দরিদ্র মানুষের অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে। চাকরির সুযোগ ক্রমশ কমছে।
তিনি বলেন, যে পরিবর্তনের স্বপ্ন মানুষ দেখেছিল তাতে মাত্র কয়েক মাসেই ধূলো জমেছে। রাজপথে বিক্ষোভে অংশ নেয়া অনেকেই হতাশ হয়ে পড়ছে। মিসরীয়রা ভাল বেতন, কাজের সুন্দর পরিবেশ এবং অনেক বেশি কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা চায়। তাদের স্বপ্ন ধূসর হয়ে পড়ছে। এসব কিছু বিবেচনায় নিলে মিশরের মানুষের সত্যিকারের বিপ্লব এখনো হয়নি। অনেক জায়গাতেই বিপ্লব ঘটা এখনো বাকি আছে।
মিশরের মোট জনসমষ্টির দুই-তৃতীয়াংশের বয়সই ৩০ বছরের নিচে। তাদের তিন ভাগই আবার কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করা বহু তরুণ এখনো বেকার। এই তরুণদের বড় অংশই রাজপথে মোবারক বিরোধী বিক্ষোভে সক্রিয় ছিল। বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষকে সংঘটিত ও নেতৃত্বদানের কাজটিও করেছে তারা। কিন্তু তাদের ভাগ্যে আজও চাকরি জুটেনি। অথচ বিক্ষোভের দিনগুলোতে তাদের বিশ্বাস ছিল মোবারকের পতনের পর এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে। উল্টো মিসরে বেকারত্বের হার বাড়ছে। বিস্ময়কর হচ্ছে গত বছরের তুলনায় এ বছর দেশে বেকারত্বের হার বেড়েছে ১১ দশমিক ৯ ভাগ।
তবে এই অবস্থার পরিবর্তন হবে বলে অনেকেই আশাবদী। ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের (আইএলও) লেবানন অফিসের কর্মকর্তা নাদা আল নাসিফ জানিয়েছেন, মিসরের বর্তমান কর্মসংস্থান পরিস্থিতিকে কিছুটা হতাশাব্যঞ্জক মনে হতে পারে। কিন্তু ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। ক্রান্তিকালীন এই সময়টা পেরিয়ে গেলে সরকারি পর্যায়ে বিরাটসংখ্যক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এদিকে মানুষের আকাশচুম্বি প্রত্যাশার বিষয়টি অজানা নয় দেশটির সুপ্রিম কাউন্সিলের। সেনাবাহিনী পরিচালিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ঐক্য ও সামাজিক বিচার মন্ত্রী ডক্টর গোদা আবদেল খালেক বলেছেন, মিসরীয় নাগরিকদের অধিকার আছে আরো বেশি চাওয়ার। তাদের প্রত্যাশার বিষয়টি মোটেও অযৌক্তিক নয়। প্রত্যাশা পূরণের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করেছে মানুষ। এখন তারা সম্ভাব্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেতে চাইবে। এ জন্য কম ত্যাগ স্বীকার করেনি সাধারণ মানুষ।
তিনি স্বীকার করেন দেশে খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়েছে। এনিয়ে মানুষের মধ্যে কিছুটা অসন্তুষ্টিও আছে। তিনি বলেন, সরকার বিরোধী বিক্ষোভ ও অস্থিরতা প্রভাব ফেলেছে দেশের অর্থনীতিতে। রাজপথে তুমুল আন্দোলনের দিনগুলিতে গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী তাদের সফর বাতিল করেছে। এতে বিনিয়োগ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বিক্ষোভের আগে পর্যটন খাতছিল অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। পর্যটন শিল্পে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে মানুষের জীবন-যাপনে।
সরকারি এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার সময়েও মিশরে যতো পর্যটক ভ্রমণ করেছেন মোবারকের পতনের পর সে সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল, মে এবং জুন এই তিন মাসে দেশটিতে ২২ লাখ বিদেশি পর্যটক ভ্রমণ করেছেন। কিন্তু গত বছরের একই সময়ে পর্যটকের সংখ্যা ছিল ৩৫ লাখ।
ঐক্য ও সামাজিক বিচারমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকার পর্যটন শিল্পের বিকাশে ও পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে নতুন চিন্তা-ভাবনা করছেন। একই সঙ্গে অর্থনীতি পুনর্গঠনে কৃষি এবং শিল্পায়ন প্রক্রিয়াকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন। কিন্তু সরকারের এসব উদ্যোগ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কতোটা কার্যকর অবদান রাখতে সম্ভব হবে সে প্রশ্নও আছে বিশেষজ্ঞদের মাঝে। তারা বলছেন রাজপথে বিক্ষোভকারী তরুণদের চাহিদা পূরণে সরকারের দক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ। কর্মহীন তরুণরা সরকারি আশ্বাসের চেয়ে দ্রুততম সময়ে চাকরির নিশ্চয়তা চায়।
এ প্রসঙ্গে বিচারমন্ত্রী আবদেল খালেক বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে ডিগ্রি অর্জনের সঙ্গে সঙ্গেই প্রত্যেক তরুণ একটি খুব ভালো চাকরি পেয়ে যাবে এমন প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। অনেক মিশরীয় নাগরিকই এখন এই বিষয়টি অনুধাবনে সক্ষম হচ্ছে যে, আপনি কোথায় কাজ করছেন আর কি কাজ করছেন তারচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সব কাজই মর্যাদাপূর্ণ এবং দিন শেষে কতো টাকা আয় করছেন।
তরুণদের মোবারক বিরোধী বিক্ষোভে যোগ দেয়ায় একটি বড় কারণ ছিল প্রশাসনিক দুর্নীতির বিস্তার রোধ করা। তাদের অনেকেরই ধারণা মোবারকের পরিবার, তার পরিষদবর্গ, উচ্চপদস্থ সামরিক-বেসামরিক আমলা এবং ব্যবসায়ী গোষ্ঠী দুর্নীতিতে জড়িয়ে না পড়লে দেশের অর্থনীতি আরো বেশি ভাল থাকতো। দেশ হিসাবেও মিসর অনেক ধনী রাষ্ট্র হত। কিন্তু দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে তরুণরা স্পষ্টতই এখন হতাশ হয়ে পড়ছে। সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় দুর্নীতির বিষয়টি এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে না। তার চেয়ে দৈনন্দিন সমস্যা মোকাবেলা নিয়েই সরকার বেশি উদ্বিগ্ন। এ অবস্থা তরুণদের ক্ষুব্ধ করে তুলছে। তবে দুর্নীতি নির্মূলে অভিযান থেমে নেই সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে বিষয়টি বারবার জানানো হচ্ছে। অর্থনীতি পুনর্গঠন, দুর্নীতি হ্রাস, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য দেশটির সরকার মানুষের কাছে সময় চেয়েছে এবং সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছে।
দি ব্যাটেল ফর ইজিস্ট-এর লেখক রাশিদি বলেছেন, মানুষ দীর্ঘদিন ধৈর্য ধরে থাকবে না। বহু ক্ষেত্রে মিশরীয় বিপ্লব ঘটতে এখনো বাকী আছে। আমি মনে করি নতুন করে আবারো বিদ্রোহের সূচনা হবে।
স্টিভ জবসের শেষকৃত্য গোপনে সম্পন্ন
এ্যাপলের সহপ্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবসের শেষকৃত্য শুক্রবার খুব গোপনে সম্পন্ন হয়েছে। জবসের পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তির বরাত দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ খবর জানায়। খবর এএফপি ও ওয়েবসাইটের।
স্টিভ জবসের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে পরিবারের সদস্য, কয়েকজন আত্মীয় ও বন্ধু ছাড়া অন্য কেউ উপস্থিত ছিলেন না। তবে শুক্রবার কখনও কোথায় শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়েছে তা জানা যায়নি। এদিকে ‘লেটস টক আইফোন’ সেস্নাগানে নতুন সংস্করণের আইফোন বাজারে আনতে ৪ অক্টোবর একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল এ্যাপল কর্তৃপৰ। সে অনুষ্ঠানেই জবস ভক্তরা ১৪ অক্টোবর ‘স্টিভ জবস ডে’ পালন করার জন্য কর্তৃপৰকে অনুরোধ করেছিল। আর ৫ অক্টোবরই মারা যান জবস। ভক্তরা ‘স্টিভ জবস ডে’ নামে একটি ওয়েবসাইটও খুলেছে।
এ্যাপল জানিয়েছে, তাদের সহপ্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবসের কোন আনুষ্ঠানিক শেষকৃত্যের পরিকল্পনা নেই তাদের। তবে তারা জবসের জীবন নিয়ে একটি স্মরণসভা আয়োজনের পরিকল্পনা করেছেন। গত বুধবার মাত্র ৫৬ বছর বয়সে অগ্নাশয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান এ্যাপল কম্পিউটার, ম্যাকিনটোশ, আই-ম্যাক, আইপড, আইফোন ও আইপ্যাডের জনক স্টিভ জবস।
হাক্কানি জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নয়: পাকিস্তান সেনাবাহিনী
ওয়াশিংটনের চাপ বাড়ার পরও হাক্কানি জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে না পাকিস্তান সেনাবাহিনী। পাকিস্তানের এক কর্মকর্তা গতকাল সোমবার এ কথা জানান।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আশফাক পারভেজ কায়ানি গত রোববার সেনাবাহিনীর শীর্ষ কমান্ডারদের সঙ্গে বিশেষ বৈঠক করেন। দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে এই বৈঠকে আলোচনা হয়।
পাকিস্তানের সেনা গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই হাক্কানি নেটওয়ার্ককে সহযোগিতা করছে বলে যুক্তরাষ্ট্র যে অভিযোগ করছে, বৈঠকে তা নাকচ করা হয়। সেনা কর্মকর্তারা অঙ্গীকার করেন, যেকোনো ধরনের আন্তসীমান্ত হামলার সমুচিত জবাব দেওয়া হবে।
কাবুলে সম্প্রতি মার্কিন দূতাবাসসহ অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য হাক্কানি জঙ্গিগোষ্ঠীকে দায়ী করছে যুক্তরাষ্ট্র। সংগঠনটি পাকিস্তানের উত্তর ওয়াজিরিস্তানে অবস্থান নিয়ে আফগানিস্তানে কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে বলে মনে করে ওয়াশিংটন। এ জন্য ওয়াজিরিস্তানে সেনা অভিযান চালানোর জন্য ইসলামাবাদকে চাপ দিচ্ছে মার্কিন প্রশাসন।
এক সেনা কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে পাকিস্তানের এক্সপ্রেস ট্রিবিউন পত্রিকা গতকাল জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ ও দাবি প্রতিহত করতে রোববারের বৈঠকে সেনা কর্মকর্তারা একমত হন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে দিয়েছি, এ বিষয়ে পাকিস্তান ইতিমধ্যে যা করেছে, তার থেকে বেশি কিছু করতে পারবে না।’
বিশ্লেষকেরা বলছেন, হাক্কানির বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গেলে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হতে পারে। কেননা, ওই অঞ্চলের অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জোরালো সম্পর্ক গড়ে তুলেছে হাক্কানি গ্রুপ। এ ছাড়া প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলে তাদের অবস্থান বেশ শক্তিশালী।
দুই সপ্তাহ আগে কাবুলে মার্কিন দূতাবাস ও ন্যাটো সদর দপ্তরে হামলা চালায় জঙ্গিরা। এ জন্য হাক্কানিকে দায়ী করেন মার্কিন কর্মকর্তারা। তাঁরা বলছেন, গোয়েন্দা তথ্য ও ফোনালাপের সূত্র ধরে তাঁরা জানতে পেরেছেন, আইএসআইয়ের সঙ্গে জড়িতে লোকজনের সঙ্গে হামলাকারীদের যোগাযোগ ছিল।
এদিকে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রেহমান মালিক বলেন, হাক্কানি নেটওয়ার্ক নিয়ে যেসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তার দায়ভার যুক্তরাষ্ট্রকেও নিতে হবে। কেননা, আফগানিস্তানে সোভিয়েত দখলদারিত্বের সময় সিআইএ এই নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করেছে। তারাই এদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। রয়টার্স, এএফপি ও পিটিআই।
কুলি থেকে প্রেসিডেন্ট
লন্ডনের ভিক্টোরিয়া স্টেশনে অন্য সব পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মতো তিনিও করতেন ঝাড়ামোছার কাজ। সুযোগ পেলে করতেন কুলির কাজও। এভাবে চলত তাঁর দিন। বড় হওয়ার স্বপ্ন, মানবকল্যাণের ব্রত ও নিরলস চেষ্টা তাঁকে নিয়ে গেছে সাফল্যের শিখরে। রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্ম থেকে তিনি পৌঁছে গেছেন রাষ্ট্রপ্রধানের আসনে।
সেদিনের সেই পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও কুলিই আজ জাম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট মাইকেল সাতা। গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত সে দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৪৩ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন তিনি। গত শুক্রবার শপথ নিয়েছেন। দায়িত্ব গ্রহণ করেই দুর্নীতি দমনের অঙ্গীকার করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি লন্ডনের রেলওয়ে স্টেশনের চেয়েও মাতৃভূমিকে বেশি পরিচ্ছন্ন রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ৭৪ বছর বয়সী সাতা আট সন্তানের জনক।
পূর্বসূরি রুপিয়া বান্দার সাবেক সরকারের সমালোচনা করে সাতা বলেছেন, দুর্নীতির ব্যাপারে বান্দার সরকার ছিল নমনীয়। তাই তাঁর প্রথম কাজ হচ্ছে দুর্নীতি দমন করে দেশের খনিজ সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন করা।
স্পষ্টভাষী বলে ‘কিং কোবরা’ হিসেবে পরিচিত সাতা। জাম্বিয়া যখন ব্রিটিশ-শাসকদের উপনিবেশ ছিল, ওই সময় সাতার জন্ম। তিনি লন্ডনে যান গত শতকের পঞ্চাশের দশকের দিকে। পরে পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও কুলি হিসেবে কাজ করেন ভিক্টোরিয়া স্টেশনে। কাজের ফাঁকে খণ্ডকালীন পড়াশোনা করেছেন। দেশে ফিরে যোগ দেন পুলিশ বাহিনীতে।
সারা দেশের মানুষ নিরাপদ পানি পান করার সুযোগ না পাওয়া পর্যন্ত নিজে কোনো বোতলজাত পানি পান করবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন সাতা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কারণেই সাধারণ মানুষের মন জয় করেছেন তিনি। গঠন করেন প্যাট্রিওটিক ফ্রন্ট।
খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ দেশটিতে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ও প্রভাবের ঘোরবিরোধী সাতা। সমালোচকেরা বলছেন, সাতার বেইজিংবিরোধী এ মনোভাবের কারণে জাম্বিয়ার অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা জাম্বিয়ার নতুন প্রেসিডেন্টকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন, সাতার সরকারের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত তাঁর দেশ। এএফপি।
