প্রতি মুহূর্তে দৃশ্যপট পাল্টাচ্ছে নারায়ণগঞ্জের। ক্রমে শামীম ওসমানের পক্ষে আওয়ামী লীগের সমর্থন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অপরদিকে দলের সমর্থন প্রত্যাশী আরেক প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী সাধারণ মানুষের সমর্থন আর ব্যক্তি ইমেজে লড়ছেন নির্বাচনে। ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন চারদলীয় জোটের সমর্থনপুষ্ট বিএনপি নেতা এডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার। হেভিওয়েট এ তিন প্রার্থী তুমুল প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন দিনভর। নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন। ভোটের হিসাবে দৃশ্যত আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থক প্রার্থীর মধ্যে লড়াই হওয়ার কথা থাকলেও ভোটের আগেই এখন স্নায়ুযুদ্ধ চলছে ক্ষমতাসীন দলের দুই প্রার্থীর মধ্যে। শামীম ওসমানকে কৌশলে আওয়ামী লীগের সমর্থন প্রকাশ করায় ভোটের মাঠে এখন মূলত আওয়ামী লীগ আর আওয়ামী লীগের অঘোষিত সমর্থন দেয়া প্রার্থীর সঙ্গেই লড়ছেন আইভী। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের পক্ষ থেকে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মাঝে নানা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে তাকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হলেও সাবেক এই পৌর মেয়র তার অবস্থানে অনড়। তার সমর্থক নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করার পাশাপাশি তিনি ভোটারদেরও মন জয়ে ব্যস্ত। তবে দলীয় সমর্থন নিয়ে আওয়ামী লীগের লুকোচুরি ও কৌশলী অবস্থানকে আইভীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের লড়াই বলেই মনে করছেন নারায়ণগঞ্জের সাধারণ ভোটাররা। আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে শামীম ওসমানকে দলীয় সমর্থন দেয়া এবং নেতাদের প্রচারণায় নামার কারণে আইভীর দলীয় সমর্থন পাওয়ার এখন আর কোন সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমান দলীয় সমর্থন পেয়েছেন- এটি তিনি নিজেই প্রচার করছেন। শুধু তিনি প্রচারই করছেন না। এখন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারাও প্রতিদিনই নারায়ণগঞ্জে যাচ্ছেন তার সমর্থনে। এতে আইভী বনাম আওয়ামী লীগের লড়াইয়ের বিষয়টি সাধারণ ভোটারদের কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠছে। গতকাল ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া নারায়ণগঞ্জ গিয়ে শামীম ওসমানের পক্ষে বক্তব্য রাখেন। বলেন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত হিসেবে তিনি শামীমের সমর্থনে এসেছেন। পরে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের নেতারা শামীমের পক্ষে নারায়ণগঞ্জ যাবেন। এছাড়া, আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতারা দলের হাইকমান্ডের নির্দেশেই নারায়ণগঞ্জে গিয়ে তার পক্ষে সমর্থন দিয়েছেন বলে শামীম ওসমান নিজেও বলে বেড়াচ্ছেন। শুধুুু তাই নয়, শামীম ওসমান সমর্থকরা এখন প্রচার করছেন আইভী নির্বাচিত হলে নারায়ণগঞ্জে মৌলবাদীদের রাজত্ব কায়েম হবে। আইভীর পক্ষে স্থানীয় জামায়াত-শিবির কাজ করছে। তারা আইভীকে বিজয়ী করে নিজেদের ফায়দা লুুটতে চায়। এছাড়া, শামীম ওসমানের সমর্থকরা বলে বেড়াচ্ছেন- আইভী দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে লড়ছেন। প্রচার-প্রচারণার দিক দিয়েও নারায়ণগঞ্জে এখন আলোচনা এই দুুই প্রার্থীকে নিয়ে। নির্বাচনী বক্তব্যেও তারা স্পষ্টত একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন। কৌশলে ঘায়েল করার চেষ্টা করছেন। শামীম ওসমান বরাবরই আইভীকে ‘ছোট বোন’, ‘অবুঝ’ বলে সম্বোধন করছেন। আইভী সরাসরি শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ না তুললেও পরোক্ষভাবে তিনি তাকে ইঙ্গিত করেই বক্তব্য রাখছেন। তার নির্বাচনী প্রচারপত্রেও তিনি সন্ত্রাস ও দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির বিরুদ্ধে বক্তব্য তুলে ধরছেন। নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের দুই প্রার্থী ছাড়া চারদলীয় জোটের সমর্থন নিয়ে মাঠে আছেন বিএনপি নেতা এডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার। দল ও জোটের নেতাকর্মীদের নিয়ে তিনি প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলেও ভোটের মাঠে তাকে নিয়ে আলোচনা কম। আলোচিত হচ্ছেন ক্ষমতাসীন দলের দুই প্রার্থী। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে দলীয় প্রার্থী-সমর্থক নিয়ে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড চিন্তা-ভাবনা করলেও এ নিয়ে কোন সমাধান করতে পারেনি। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা দলের সমর্থন প্রত্যাশী দুই প্রার্থীর সঙ্গে একাধিক বৈঠক করলেও কোন সিদ্ধান্ত দিতে পারেন নি। পরে দলের কেন্দ্রীয় নেতারাও আরও কয়েক দফা বৈঠক করে কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেন নি। নেতারা শুরু থেকেই শামীম ওসমানকে সমর্থন দেয়ার পক্ষে ছিলেন। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে নেতারা সেলিনা হায়াৎ আইভীকে নানাভাবে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে উদ্যোগী হন। কিন্তু আইভী অনড় থাকায় তাদের কোন চেষ্টাই সফল হয়নি। শেষ পর্যন্ত বিকল্প হিসেবে শামীম ওসমানকে মন্ত্রী করার শর্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। শামীম এতে রাজি না হওয়ায় তাকেই সমর্থন দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। নির্বাচন কমিশনের বিধি ও নির্বাচনের ভোটে জয়-পরাজয়ের হিসাব কষে দলীয়ভাবে কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে। ইঙ্গিতে শামীমের পক্ষে দলীয় সমর্থন প্রকাশের পরও আইভীর পক্ষে স্থানীয় নেতাকর্মীদের শক্ত অবস্থান থাকার বিষয়টি নিয়েও এখন চিন্তিত ক্ষমতাসীন দল। তবে আওয়ামী লীগ চাইছে শামীম ওসমানকে মেয়র হিসেবে বিজয়ী করে দলের লক্ষ্য পূরণ করতে। এ জন্য দলীয়ভাবে সব চেষ্টাই করা হবে। যেহেতু স্থানীয় সরকার নির্বাচন তাই দলের অবস্থান হবে কৌশলী। দল সমর্থিত প্রার্থীর জয়ের জন্য কাজ করতে দলের সহযোগী সংগঠনের নেতাদের শামীম ওসমানের পক্ষে নির্বাচনে কাজ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে নেতারা নারায়ণগঞ্জে যাবেন। কিন্তু শামীম ওসমানের জয়ের বিপরীতে দলের অপর প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করছে আওয়ামী লীগ। এক্ষেত্রে উল্টো ফলাফল হলে দলের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে এমনটা ভেবে আওয়ামী লীগ কৌশলে এগোচ্ছে। প্রাথমিকভাবে অনানুষ্ঠানিকভাবে শামীম ওসমানকে সমর্থন দিয়ে আইভীকে মানসিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়। দলীয় হাইকমান্ডের মাধ্যমে আইভীকে শেষ সতর্ক সঙ্কেত দেয়া হয়েছে। তার মনোভাব বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে তার অনড় অবস্থানের কারণে ধীরে ধীরে দল অবস্থান পরিষ্কার করবে। ইতিমধ্যে দলের তিন সাংগঠনিক সম্পাদকের নারায়ণগঞ্জে যাওয়ার পর শনিবার যুবলীগের ছয় কেন্দ্রীয় নেতা নারায়ণগঞ্জে যান। তারাও শামীম ওসমানের পক্ষে কেন্দ্রের সমর্থন ব্যক্ত করেন। স্থানীয় যুবলীগের এক বর্ধিত সভায় কেন্দ্রীয় নেতারা ঘোষণা দেন যারা দলের এই সিদ্ধান্তের বাইরে কাজ করবে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গতকাল ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নারায়ণগঞ্জ গেলেন। দলীয় সূত্র জানায়, নির্বাচনের আগে শামীম ওসমানের পক্ষে দলের কেন্দ্রীয় নেতারাও পর্যায়ক্রমে নারায়ণগঞ্জে আসবেন। এছাড়া, আওয়ামী লীগের অন্য সহযোগী সংগঠন ও ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের নেতারাও শামীম ওসমানের পক্ষে নারায়ণগঞ্জে যাবেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। এদিকে দল ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা শামীম ওসমানের পক্ষে অবস্থান নিলেও দলের কেন্দ্রীয় নেতারা এখনও সরাসরি কোন ঘোষণা না দেয়ায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি কিছুতেই কাটছে না। দলের নেতাকর্মীরা দলের দুই প্রার্থীর পক্ষে ভাগ হয়ে কাজ করছেন। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে নেতারা শামীম ওসমানকে সমর্থন দেয়ায় আইভী সমর্থকরা এখন মনে করছেন তারা দলের বিরুদ্ধে লড়ছেন। আইভী সমর্থক জেলা ও শহর আওয়ামী লীগের নেতারা জানিয়েছেন, দল সরাসরি কাউকে সমর্থন না দিলেও শামীম ওসমানের পক্ষে কাউকে কোন কিছু না জানিয়ে নেতারা এসে সমর্থন দেয়ায় মনে হচ্ছে দলই এখন আইভীর বিরুদ্ধে লড়ছে। তারা জানিয়েছেন, আগে তারা আইভীকে নির্বাচন থেকে বিরত রাখতে নানা কৌশল প্রয়োগ করে ব্যর্থ হন। এখন তারা তাকে পরাজিত করার কৌশল নিয়ে এগোচ্ছেন। জেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, আইভীকে কোনভাবেই ঠেকিয়ে রাখা যাবে না বলে দলীয়ভাবে তাকে দমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সূত্র জানায়, এ জন্য দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে কৌশলে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। বিভ্রান্তির কারণে অনেক নেতাকর্মী আগে সরব থাকলেও এখন কোন প্রার্থীর পক্ষেই কাজ করছেন না। এছাড়া, নির্বাচনী এলাকায় আইভীকে নিয়ে আরও নানা আলোচনা হচ্ছে ভোটারদের মুখে মুখে। আইভী দলীয় সমর্থন না পেলে বিএনপি’র সমর্থন নিয়ে নির্বাচন করবেন এমনটি আগে আলোচনা হলেও তিনি নিজেই তা নাকচ করে দিয়েছেন। এখন বলা হচ্ছে ইভিএম-এর ব্যাপারে আপত্তি তুলে শেষ মুহূর্তে চার দলের সমর্থনপুষ্ট এডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন। এক্ষেত্রে বিএনপি ও সমমনা দলের পক্ষ থেকে সেলিনা হায়াৎ আইভীকে সমর্থন দেয়া হতে পারে। এমনটি হলে ভোটের হিসাবও পুরো পাল্টে যাবে। এধরনের কোন ঘটনা ঘটলে আওয়ামী লীগ সমর্থক প্রার্থীর জয়ের কোন সম্ভাবনা থাকবে না। এ বিষয়টিও বেশ আলোচনা হচ্ছে নারায়ণগঞ্জে। এছাড়া, শামীম ওসমানের সমর্থকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে- স্থানীয় জামায়াতে ইসলামী আইভীর পক্ষে কাজ করছে। তারা আইভীকে বিজয়ী করে নির্বাচন পরবর্তী সুবিধা আদায় করতে চায়। তবে আইভী সমর্থকরা বলছেন, তার ব্যক্তি ইমেজ নষ্ট করতেই এ ধরনের প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
তত্ত্বাবধায়ক ছাড়াই আগামী নির্বাচন হবে :প্রধানমন্ত্রী
0 রাজনীতি করতে চাইলে বেগম জিয়াকে নির্বাচনে আসতেই হবে
0 নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী করতে বিরোধী দলের প্রস্তাব চাই
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের পথ পরিহার করে আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়াই আগামী নির্বাচন হবে। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, নির্বাচন হবেই, হবেই, হবেই। কারণ দেশের জনগণ নির্বাচন চায়। বিরোধী দলীয় নেতার প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, উনি এতো কথা বলছেন, কিন্তু উনিও নির্বাচনে আসবেন। গণতন্ত্রে বিশ্বাস করলে, রাজনীতি করতে চাইলে তাকে নির্বাচনে আসতেই হবে।
গতকাল শনিবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন গণভবনে এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে এ কথা বলেন। মূলত জাতিসংঘের ৬৬তম সাধারণ অধিবেশনে যোগদান শেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর ১১ দিনের সরকারি সফরে অর্জিত সফলতা তুলে ধরতেই এ সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী দেশের সর্বশেষ রাজনীতিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের খোলামেলা জবাব দেন।
আগামী সেপ্টেম্বরে সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দলীয় নেতার ‘ফাইনাল খেলা’র হুমকি প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাছাই পর্ব বা সেমিফাইনাল না খেলেই ফাইনাল খেলা হয় কীভাবে? যিনি যত খেলা খেলতে চান খেলুক, আর যারা দেশের জন্য কাজ চায় তারা করে যাবে। কারণ আমরা কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী। বিরোধী দল ও সরকারের মধ্যে চলমান রাজনৈতিক মতপার্থক্য দূর করতে কোন আলোচনার উদ্যোগ নেয়া হবে—কিনা এমন এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দলীয় নেতা সরকারকে উত্খাতের জন্য সময় বেধে দিয়েছেন, তাহলে আর কীসের আলোচনা? তবে তিনি বিরোধী দলসহ সকলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী সংসদে এসে সব বিষয়ে যতক্ষণ ইচ্ছা কথা বলার জন্য বিরোধী দলীয় নেতার প্রতি আবারো আহ্বান জানান।
সকলের সাথে আলোচনা ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) শক্তিশালী করে পুনর্গঠনে বিরোধী দল যে প্রস্তাব দিয়েছে তাকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, আমরাই চাই নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী করতে। বিরোধী দলসহ সকলের সম্মতি ও আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠিত হোক। যাতে দেশের জনগণ স্বাধীনভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জনগণ নির্বাচন চায়। আর স্বাধীনভাবে ভোট প্রদান জনগণের সাংবিধানিক অধিকার। জনগণ যদি ভোট না দেয়, সেই ক্ষমতা আমরা চাই না। গ্রেনেড হামলা চালিয়ে বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন, সংসদ সদস্যদের গুলি ও গ্রেনেড মেরে হত্যা কিংবা নির্বাচন ছাড়া অবৈধভাবে ক্ষমতায় থাকার রাজনীতিতে আমরা বিশ্বাস করি না। ভবিষ্যতে কোন অপশক্তি জনগণের ভোটের অধিকার যাতে কেড়ে না নিতে পারে সেজন্যই জনগণের ক্ষমতা নিশ্চিত করাই হচ্ছে আমার রাজনীতির মূল লক্ষ্য।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন নয় বিরোধী দলীয় নেতার এমন হুঁশিয়ারি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দলীয় নেতা আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গে বলেছিলেন পাগল ও শিশু ছাড়া নাকি আর কেউ নিরপেক্ষ নন। তিনি এখন তেমন কোন পাগল বা শিশু খুঁজে পেয়েছেন কী না জানি না। ২০০৭ সালের ১ জুলাই নিউইয়র্কে পৃথক দুটি টেলিকনফারেন্সে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরোধিতা করে খালেদা জিয়া বলেছিলেন, জনগণই একদিন এই ব্যবস্থার বিলুপ্তি চাইবে। তাছাড়া জেল থেকে মুক্তির পরও তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গে তিনি (খালেদা জিয়া) বলেছিলেন, দেশে ‘কন্ট্রোলড ডেমোক্রেসী’ চলছে। আমার প্রশ্ন, তবে তিনি যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাইছেন তার মাধ্যমে আবারো কী কন্ট্রোলড ডেমোক্রেসী চান? উনি এতো তাড়াতাড়ি কিভাবে ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী নিজের গ্রেফতার, দুই পুত্রকে নির্যাতনসহ শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির কথা ভুলে গেলেন? এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য বেগম জিয়াই দায়ী। পর পর তিনবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নির্বাচনের তিক্ত অভিজ্ঞতা দেশের সব মানুষের রয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে রায় দিয়েছে। আমরা সেই রায়ের আলোকে সংবিধান সংশোধন করেছি। তাহলে কী বিরোধী দলীয় নেত্রী সর্বোচ্চ আদালতের রায়ও মানেন না?
বিরোধী দলীয় নেতার উদ্দে্যে তিনি আরো বলেন, যিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন করবেন না বলছেন, তিনিই এবং তার দল বিএনপি ২০০১ সালে লতিফুর রহমানের তত্ত্বাধায়ক সরকারকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় এসেছিলেন। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ২০০৬ সালে জোর করে ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে বিএনপির সাবেক আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান করার জন্য বিচারপতিদের বয়স বাড়াতে সংবিধান সংশোধন করেছিল। তারা এক কোটি ২৩ লাখ ভুয়া ভোটার দিয়ে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার আসার স্বপ্ন দেখেছিল। সংবিধানে ৫৮ (গ) অনুচ্ছেদ যথাযথ অনুসরণ না করে আজ্ঞাবহ দলীয় রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দীনকে প্রধান উপদেষ্টা করে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অপচেষ্টা করেছিল। দেশে নেমে এসেছিল ওয়ান ইলেভেনের দুর্যোগ, আতঙ্কের শাসন। খালেদা জিয়ার দুর্নীতি, ক্ষমতার লোভ ও অপকর্মের ফসল ছিল বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সে সময় দেশে যে আতঙ্কের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল তার পুনরাবৃত্তি বাংলাদেশের কোনো গণতন্ত্রকামী মানুষ আর দেখতে চায় না।
ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার কর্তৃক তাঁকে দেশে ফিরতে বাধা এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফেরার ঘটনা বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই সময় ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফিরেছিলাম বলেই দেশে নির্বাচন হয়েছে, গণতন্ত্র এসেছে। আমি দেশে না ফিরলে তো খালেদা জিয়া দুর্নীতিবাজ পুত্রকে নিয়ে দেশ ত্যাগের জন্য প্রস্তুতি নিয়েই রেখেছিলেন। আমি এসেছিলাম বলেই তিনি সাহস পেয়েছিলেন। তিনি বলেন, ওই সময় আমাকে দেশে ফিরলে মৃত্যুরও হুমকি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু আমি জাতির পিতার কাছ থেকেই শিখেছি দেশের মানুষের জন্য জীবনের যেকোন ঝুঁকি নিতে।
সম্প্রতি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে জামায়াত-শিবিরের বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনকালে পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধাপরাধী, দুর্নীতিবাজ এবং বিদেশে অর্থ পাচারকারীদের বাঁচাতে বিরোধী দলের আন্দোলন জনগণের কাছে কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না। তবে তিনি যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে বিরোধী দলীয় নেতার প্রকাশ্য সমর্থনের কঠোর সমালোচনা করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, বিরোধী দলীয় নেতা নাকি বলেছেন দেশের মানুষ অশান্তিতে রয়েছে। আসলে দেশের জনগণ নয়, অশান্তিতে রয়েছেন তিনি নিজেই। কারণ দেশের জনগণ শান্তিতে থাকলে তার অশান্তি বাড়ে। কারণ ক্ষমতায় থেকে তার বিদায় নেয়া এবং দুই দুর্নীতিবাজ সন্তানের লুটপাটের সুযোগ বন্ধ হওয়ার কষ্ট তাঁর আছে। সেনানিবাসের দখলকৃত বাড়ি ছাড়তে তিনি যে কেঁদেছেন, অন্য কোন সময় তা দেখা যায়নি।
নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়া বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ নাকি ৩০ আসনও পাবে না, আমি নাকি বিরোধী দলীয় নেতা হতে পারবো না। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস খালেদা জিয়ারাই ৩০ আসনের কম পেয়েছেন। এরশাদকে যদি আমরা কয়েকটি উপ-নির্বাচনের আসন ছেড়ে দিতাম তবে খালেদা জিয়া বিরোধী দলীয় নেত্রীও হতে পারতেন না। কিন্তু আমরা তা চাইনি। তিনি বলেন, সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেও দুই পুত্রকে একাডেমিক শিক্ষা দিতে না পারলেও খালেদা জিয়া জনগণের অর্থসম্পদ লুণ্ঠন, দুর্নীতি, বিদেশে অর্থ পাচার, সন্ত্রাস, মানুষ হত্যার ষড়যন্ত্র ভাল করেই শিখিয়েছেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার নয়, বিদেশী আদালতেই বিরোধী দলীয় নেত্রীর দুই পুত্রের দুর্নীতি প্রমাণ হয়েছে। এ বিষয়ে অযথা আমাদের দোষ দিয়ে কী লাভ।
সম্প্রতি রাজধানীতে চারদলীয় জোটের জনসভায় বিরোধী দলীয় নেতার দেয়া বক্তব্যের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার দাবি (খালেদা জিয়া) দেশে নাকি গণতন্ত্র নেই। গণতন্ত্র নাকি অবরুদ্ধ! গণতন্ত্র অবরুদ্ধ হলে বিরোধী দলীয় নেতা সমাবেশ করলেন কীভাবে। তিনি বলেন, তার (খালেদা) রাজনীতির লক্ষ্য হচ্ছে—দুই দুর্নীতিবাজ ছেলেকে বিচারের হাত থেকে বাঁচানো। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী, লাখো শহীদের হত্যাকারীদের রক্ষা।
আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ে খালেদা জিয়ার অভিযোগকে ‘হাস্যকর’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, র্যাব কাদের সৃষ্টি? তিনি (খালেদা) র্যাব ও পুলিশকে ট্রেনিং না দেয়ার জন্য বিদেশীদের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন। খালেদা জিয়ার ইচ্ছা কী? জনগণকে নিরাপত্তাহীন করা? দেশকে সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিণত করা? জঙ্গিদের কাছে বাংলাদেশকে জিম্মি করা? তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ক্রসফায়ার নামক শব্দটি কার আমলে শুরু হয়েছিল? ২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় খালেদা জিয়া নিজেই ক্রসফায়ার নিয়ে গণমাধ্যম ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে দাবি করে বলেছিলেন, ক্রসফায়ার নয়, র্যাব ও সন্ত্রাসীদের বন্দুকযুদ্ধে মানুষ মারা যাচ্ছে।
শেখ হাসিনা বলেন, খালেদা জিয়া আইন-শৃংখলার কথা বলেন। কিন্তু বর্তমান সরকারের আড়াই বছরে তাঁর শাসনামলের মতো একই সময় ৫শ স্থানে বোমা হামলার ঘটনা ঘটেনি, বিরোধী দলীয় নেতার ওপর গ্রেনেড হামলা হয়নি। বিরোধী দলের কোন এমপি নিহত হয়নি।
তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার শাসনামলে ছবিরানী, মাহফুজা, পূর্ণিমা, বেদানা, রজুফা, ফামিহা, মহিমা ধর্ষণ, ভোলায় একরাতে একশ নারীকে গণধর্ষণ, নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় একরাতে ৭০ নারী ও মেয়ে-শিশু ধর্ষণ, গফরগাঁয়ে আওয়ামী লীগ কর্মী মোজাম্মেলের ভিটেমাটি কেটে পুকুর বানানোর কথা এদেশের মানুষ কখনো ভুলবে না।
জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো দলকে নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা আমাদের নেই। তবে সন্ত্রাস যেই করবে তার বিচার হবেই। মন্ত্রিসভা রদবদলের বিষয়ে তিনি উত্তর এড়িয়ে গিয়ে বলেন, পরিবর্তন হলে তা সবাই দেখবে। আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারের সময়সীমা বেধে দেয়া সম্পর্কিত অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কর্নেল অলি সাহেব বাজেট পর্যন্ত সময় দিয়েছিলেন! আর বিরোধী দলীয় নেত্রী এক বছর সময় বাড়িয়ে দিয়েছেন। এজন্য তাঁকে ধন্যবাদ। আমি দৃঢ়ভাবে আশাবাদী, তিনি (খালেদা জিয়া) পরবর্তীতে আবারও সময় বাড়াবেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগের ওয়াদা ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আমরা করবোই।
সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন এবং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে তাঁর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশের অর্জিত সাফল্যগুলো তুলে ধরেন। তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নারী ও শিশু-স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়নের জন্য অর্জিত আন্তর্জাতিক সম্মানজনক সাউথ সাউথ পুরস্কার দেশবাসীর কাছে উত্সর্গ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শান্তিই হচ্ছে উন্নয়নের সোপান। আর শান্তি তখন বিরাজ করে, যখন ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে সারাবিশ্বের জন্য তার অভিজ্ঞতার আলোকে প্রণীত একটি শান্তির মডেল উপস্থাপনের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই শান্তির মডেলের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে জনগণের ক্ষমতায়ন। এটি একটি বহুমাত্রিক ধারণা যেখানে গণতন্ত্র এবং উন্নয়নকে সর্বাগ্রে স্থান দেয়া হয়েছে। বিশ্বের প্রায় তিনশ মিলিয়ন মানুষের ভাষা বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের আবেদন করেছি বলে প্রধানমন্ত্রী জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ দমনে জাতিসংঘের কমপ্রিহেনসিভ কনভেনশন চূড়ান্ত করার জন্য আমি আহ্বান জানিয়েছি। আমি স্পষ্ট ভাষায় বলেছি, বাংলাদেশ সব ধরনের সন্ত্রাসের তীব্র নিন্দা জানায়। আমরা বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে সন্ত্রাস কিংবা নাশকতামূলক তত্পরতা চালাতে দেব না। এছাড়া সফরকালে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাক্ষাত্ এবং বারাক ওবামাকে বাংলাদেশ সফরে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।
সাংবাদিক সম্মেলনে সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, ড. মশিউর রহমান, স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা, আফম রুহুল হক, তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ওবায়দুল কাদের এমপি, এডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আফজাল হোসেন, পররাষ্ট্র সচিব মিজারুল কায়েস প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। সাংবাদিক সম্মেলন শেষে প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের মধ্যাহ্ন ভোজে আপ্যায়িত করেন।
বঙ্গভবনের বিলাসী জীবন ছাড়তে চায়নি ইয়াজউদ্দিনের পরিবার
আড়াই লাখ মার্কিন তারবার্তা ফাঁস করেছে উইকিলিকস। মার্কিন কূটনীতিকদের ভাষ্যে এসব তারবার্তায় বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশের রাজনীতি ও ক্ষমতার অন্দরমহলের খবর
২০০৬ সালে ক্ষমতা ছাড়ার আগে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে সরিয়ে অন্য কাউকে নিয়োগ দেওয়ার চিন্তাভাবনা করেছিল চারদলীয় জোট সরকার। সরে যেতে আপত্তি ছিল না ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদেরও। কিন্তু আপত্তি জানিয়েছিল তাঁর পরিবার। তারা বঙ্গভবনের বিলাসী জীবন ত্যাগ করতে রাজি ছিল না।
ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাস থেকে ওই সময় ওয়াশিংটনে পাঠানো তারবার্তায় এ কথা বলা হয়। ২০০৬ সালের ২১ জুন পাঠানো ওই তারবার্তা গত ৩০ আগস্ট ফাঁস করে দিয়েছে সাড়া জাগানো ওয়েবসাইট উইকিলিকস।
তারবার্তায় বলা হয়, ১৯ জুন এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও তাঁর অন্যতম দুই নীতিনির্ধারক রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের শারীরিক অবস্থা এবং বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে তাঁকে সরিয়ে কাউকে রাষ্ট্রপতি করা যায় কি না, সে বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। ওই বছরের ২৮ অক্টোবর সরকারের মেয়াদ শেষ হলে এরপর দায়িত্ব নেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। কাজেই এর আগেই রাষ্ট্রপতির বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে সরকার।
তারবার্তায় উল্লেখ করা হয়, প্রধানমন্ত্রীর সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী দূতাবাসের এক কর্মকর্তাকে জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতির স্বাস্থ্যের বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে আলোচনা করেছেন খালেদা জিয়া। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী জানান, রাষ্ট্রপতিকে সরে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছেন এবং এ বিষয়ে তিনি তাঁদের, বিশেষ করে খন্দকার মোশাররফের পরামর্শ চেয়েছেন। ২০০২ সালে ইয়াজউদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি করার বিষয়ে খন্দকার মোশাররফই সুপারিশ করেছিলেন।
ইয়াজউদ্দিনকে সরিয়ে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই বলে মোশাররফ প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন বলে জানান সালাউদ্দিন কাদের। কেননা, ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের শারীরিক অবস্থা বেশ খারাপ এবং জানুয়ারির নির্ধারিত নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবেন বলে মনে হয় না। সে ক্ষেত্রে স্পিকার জমির উদ্দিন সরকারকে রাষ্ট্রপতি করার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন খালেদা জিয়া এবং অন্য কাউকে খুঁজে বের করার কথা বলেছেন তিনি।
তারবার্তায় বলা হয়, সিঙ্গাপুরে বাইপাস হার্ট সার্জারির পর রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন ২০ জুন দেশে ফিরেছেন। তবে তিনি বঙ্গভবনে না উঠে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে আছেন। তাঁর স্ত্রী ও ছেলে চেয়েছিলেন, তিনি বঙ্গভবনেই উঠুন, তাহলে আর রাষ্ট্রপতি পদ হারানোর ভয় থাকবে না। কিন্তু রাষ্ট্রপতি তাঁর চিকি ৎ সকদের পরামর্শ মেনে নিয়ে হাসপাতালেই ভর্তি হয়েছেন। অবশ্য সামরিক হাসপাতালের প্রধান রাষ্ট্রপতির জন্য বঙ্গভবনেই একটি নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র (আইসিইউ) স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মোখলেছুর রহমান চৌধুরী জানান, রাষ্ট্রপতি পদ ছাড়তে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ অনিচ্ছুক বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু তাঁর পরিবার এর বিরোধিতা করছে। রাষ্ট্রপতি পদ ছাড়লেও তিনি মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন। কিন্তু তাঁর পরিবারের সদস্যরা বঙ্গভবনের বিলাসী জীবন ছাড়তে অনিচ্ছুক। তিনিও স্বীকার করেছেন, নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগের ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা চলছে এবং তিনি মনে করেন, নতুন কাউকে রাষ্ট্রপতি করা হলে তা ক্ষমতাসীন দলের জন্যই ভালো হবে। কেননা, আগামী নির্বাচনে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, নতুন সরকারের পুরো পাঁচ বছর দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাবেন নতুন রাষ্ট্রপতি।
মার্কিন দূতাবাসের তারবার্তায় বলা হয়, গত ২৩ মে রাষ্ট্রপতি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার এক দিন আগে বঙ্গভবনে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষা ৎ করেন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা অভিযোগ তুলেছেন, খালেদা জিয়া নিজে রাষ্ট্রপতি পদে বসতে চাইছেন, এ জন্য ইয়াজউদ্দিনকে অসুস্থ সাজানো হয়েছে।
সবশেষে দূতাবাস মন্তব্য করে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার তিক্ততার এই পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে চারদলীয় জোট ক্ষমতা ছাড়ার আগমুহূর্তে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ বিতর্ক আরও বাড়িয়ে দেবে। ২০০২ সালে বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারণের পর যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল, আবার ফিরে আসবে সেই পরিস্থিতি। বিরোধীরা অভিযোগ তুলবে, নির্বাচনের পর যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, আগামী পাঁচ বছর বঙ্গভবনে নিজেদের পছন্দের কাউকে রাখতেই বিএনপি ইয়াজউদ্দিনকে সরিয়ে দিয়েছে।
জজ মিয়ার জবানবন্দিই সঠিক ছিল: বিএনপি
বর্তমান সরকার ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার অধিকতর তদন্ত করে যে সম্পূরক অভিযোগপত্র দিয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণতার নমুনা। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও তাঁর পরিবারের ভাবমূর্তি নষ্ট করতেই এমনটা করা হয়েছে।
আজ রোববার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলের পক্ষ থেকে এসব বক্তব্য তুলে ধরেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। আজ রাতে ওই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, ‘বিএনপির আমলে জজ মিয়া ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার যে জবানবন্দি দিয়েছিলেন, সেটাই সঠিক ছিল।’
সংবাদ সম্মেলনে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ও অভিযোগপত্র সম্পর্কে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা নিয়ে যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, তা সুসাংবাদিকতার নমুনা না। কোনো একটি মহলের উদ্দেশ্য পূরণের জন্যই গণমাধ্যম এ কাজ করেছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে গণমাধ্যমের প্রতি দলের পক্ষ থেকে রুহুল কবির রিজভী আহমেদ আহ্বান জানান।
রিজভী আহমেদ বলেন, গ্রেনেড হামলা মামলা নিয়ে গণমাধ্যমে এমনভাবে সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে যেন এ সরকারের অভিযোগপত্র সত্যি। মামলার বিচার পত্রিকাই করে দিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জেড এম জাহিদ হোসেন, বিএনপির নেতা রুহুল কুদ্দুস তালুকদার, ধর্মবিষয়ক সম্পাদক মাসুদ আহমেদ তালুকদার প্রমুখ।
পাঠকের মন্তব্য
Siddique Hossain Isha
২০১১.০৮.২১ ২০:২৪ Mr. Rijvi Ahmed… I respect you as a good politician. But, you are not suitable for that, so far?? Are you trying to make another Drama or the sequel of George Mia. Now public’s are not so fool as you think.
Bayezeed Mostaque
২০১১.০৮.২১ ২০:২৯ রিজভী আহমেদ এর নুন্নতম লজ্জা থাকলে এই কথা বলতেন না, অবশ্য উনার দোষ দিয়ে কি লাভ, বাংলাদেশের সব রাজনিতিবিদ ই তো দুধে ধোয়া তুলসি পাতা। কারো কোন দোষ নাই, শুধু দোষ আমজনতার।
Mr.Muquit Aahmed
২০১১.০৮.২১ ২০:৩০ একুশে আগসট এর সেদিনের সেই ভয়াবহ ঘটনায় আপনাদের বিএনপি সরকারের হাত ছিলোনা ,এ কথাটা কেউ বিশসাস করবেনা । সেদিন পুরা মুক্তিযুদ্দের সপক্কের দলকে পুরাপরি destroy করার জন্য যে ঘটনা ঘটানো হয়েছিলো ,তার জন্য আপনার দল বিএনপি পুরা দায়ী । আজে বাজে কথা ও মিথ্যা কথা বলার জন্য খামাখা সংবাদ সমমেলন করবেন না । সারা দেশবাসী জানে ঐ ঘটনার পিছনে কার হাত ও মদদ ছিলো । রোজা মাসে মিথ্যা কথা বলা থেকে বিরত থাকুন ।
Mirza Mahmud Ahmed
২০১১.০৮.২১ ২০:৩১ চোরের মার বড়গলা আর কিছু বলার নেই ।
Khaer
২০১১.০৮.২১ ২০:৩৫ Hasina is firmly determined to crash the opposition party according to her Bakshal Theory.
Didarul Hasan
২০১১.০৮.২১ ২০:৪০ these are the shameless politicians. they think that the people of Bangladesh are stupid to believe them. but still some people may believe this type of ‘ashare golpo’ (the blind supporter of BNP). ২০১১.০৮.২১ ২০:৪১ Madam, please follow other way to convince innocent people. Now peoples are not fool.
MAZEED
২০১১.০৮.২১ ২০:৪৩ Mr. Rizvi, If you had minimum sense of respect for others, you would not have said something nonsense like this……..it is utterly stupid to deny the report of newspapers…the reporter just published the things already in the police inquiry and report…and now its clear like day light that tareq rahman and begum zia were the master planners for this homicidal attack on hasina and awamileague….so stop your dirty games……………and pray for forgiveness in front of the nation and hasina…..
nazmul ahmed
২০১১.০৮.২১ ২০:৪৬ জনাব রিজভি, আর কত শাক দিেয় মাছ ………………………..। ?
“Sheik Mujib killing mission and informative unknown history”
ইতিহাসের নৃশংসতম বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জিয়াউর রহমান, মওলানা ভাসানীসহ ঘাতক চক্রের ভূমিকা
You should check it to know details….It should be known to all of us as a Bangladeshi.
রমজানে বেলা তিনটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত সিএনজি স্টেশন বন্ধ
রমজান মাসের ১ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত সারা দেশের সিএনজি স্টেশনগুলো বেলা তিনটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত (প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা) বন্ধ রাখা হবে। রমজানে গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়ানোর জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে পেট্রোবাংলা ও সিএনজি পাম্পস্টেশনের মালিকদের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক সভায় এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২৭ রমজানের পর থেকে আবার এখনকার মতো বিকেল পাঁচটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত সিএনজি স্টেশনগুলো (প্রতিদিন চার ঘণ্টা) বন্ধ থাকবে।
রমজান মাসে বিদ্যুত্ ও জ্বালানির সুষ্ঠু সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়ে গত সপ্তাহে বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক আন্তমন্ত্রণালয় সভায় সিএনজি স্টেশন প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা বন্ধ রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। পাম্পস্টেশনের মালিকদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সভায় আলোচনা করে এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হলো।
সিএনজি স্টেশনগুলো প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা বন্ধ রাখার ফলে পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ বাড়বে। ফলে গ্যাস ব্যবহারে কিছুটা সুবিধা হবে। বিদ্যুেকন্দ্রেও বেশি গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
সয়াবিন তেল ১০৯ টাকা, চিনি ৬৫: চিনি ও ভোজ্যতেলের দাম ঠিক করে দিলেন ব্যবসায়ীরা
ভোজ্যতেল ও চিনির দর আবারও নির্ধারিত হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ব্যবসায়ীদের কথা অনুযায়ী দর ঠিক করে দিয়েছে।
নতুন দর অনুযায়ী খুচরা বাজারে খোলা সয়াবিন তেলের লিটার ১০৯ টাকার বেশি বিক্রি করা যাবে না। আর পাম তেল বিক্রি করতে হবে ৯৯ টাকা লিটারে। অন্যদিকে চিনির দর নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৫ টাকা কেজি।
গতকাল বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এই দর নির্ধারণ করা হয়। কিছুদিন ধরে বাজারে ভোজ্যতেল ও চিনির দাম বাড়ছিল। এই দুই পণ্যের দাম বেড়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাওয়ার পর দর ঠিক করে দিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে বর্তমান বাজারদরের তুলনায় চিনির দাম খানিকটা কম ঠিক করা হলেও ভোজ্যতেলের দামে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। জানা গেছে, খুচরা বাজারে ভোজ্যতেল ও চিনির দর যা হওয়া উচিত বলে দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরা, বৈঠকে তা-ই মেনে নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে প্রধান আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রক এম এ সবুর, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) চেয়ারম্যান সারোয়ার জাহান তালুকদার, ট্যারিফ কমিশনের যুগ্ম প্রধান আবদুল কাইয়ুম, সিটি গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক বিশ্বজিৎ সাহা, আবদুল মোনেম লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন মোনেম, মেঘনা গ্রুপের উপদেষ্টা মুন্সী মর্তুজা আহমেদ, এস আলম গ্রুপের বিপণন ব্যবস্থাপক কাজী সালাউদ্দিন আহমেদসহ চিনি ও ভোজ্যতেলের পরিশোধন কারখানার অন্য প্রতিনিধি এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে মিলগেটের দরও নির্ধারণ করা হয়। নির্ধারিত দরগুলো হচ্ছে: সয়াবিন তেলের খুচরা দর ১০৯ টাকা, মিলগেটের দর ১০২ টাকা। পাম তেলের খুচরা দর ৯৯ টাকা, মিলগেটের দর ৯৫ টাকা। চিনির খুচরা দর ৬৫ টাকা আর মিলগেটের দর ৫৮ টাকা। তবে বোতলজাত ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে কোনো দর নির্ধারণ করা হয়নি গতকাল।
টিসিবির তথ্যে দেখা যায়, গতকাল রাজধানীতে সয়াবিন তেল ১০৯ থেকে ১১০ টাকা, পাম তেল ৯৬ থেকে ৯৮ এবং চিনি ৭০ থেকে ৭৪ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।
ভোজ্যতেল ও চিনির খুচরা এবং মিলগেটের দরের পার্থক্য আগে এত বেশি ছিল না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যে কয়বারই খুচরা ও মিলগেটের দর নির্ধারণ করে, তার প্রতিটিতেই খুচরা ও মিলগেটের দরের পার্থক্য ছিল চার থেকে পাঁচ টাকা। প্রথমবারের মতো গতকাল এই পার্থক্য দাঁড়ায় সাত টাকা।
যোগাযোগ করলে ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকার কোনো দর নির্ধারণ করেনি, করেছেন ব্যবসায়ীরাই। আমরা শুধু দেখেছি যে তাঁরা যা বলছেন, তা ঠিক আছে কি না।’
নির্ধারিত দরে বিক্রি না হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এ প্রসঙ্গে মজিবুর রহমান বলেন, দর বেশি রাখার আর কোনো সুযোগ নেই। এখন তো ভ্রাম্যমাণ আদালতই আছেন। কেউ অসাধুতা করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, বাণিজ্যমন্ত্রী মুহাম্মদ ফারুক খান গতকাল বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে টেক্সটেক প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে বলেছেন, ভর্তুকি দিয়ে চিনি ও ভোজ্যতেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে। অযাচিতভাবে কোনো ব্যবসায়ী ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ালে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ভোগ্যপণ্যের মজুদ যথেষ্ট পরিমাণে আছে। পাঁচটি পণ্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করছে টিসিবি। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধি, আবহাওয়া ও হরতালের কারণে কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। বাজার তদারকি করা হচ্ছে। কয়েক দিনের মধ্যে তা স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
এদিকে, ভোজ্যতেল ও চিনির সর্বোচ্চ মিলগেটের দর, বিতরণ দর, পাইকারি ও খুচরা দর ন্যায়সংগতভাবে নির্ধারণের বাধ্যবাধকতা থাকলেও কেউই তা মানছে না বলে গতকাল সব পরিশোধন কারখানার মালিকদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বিপণন ও পরিবেশক নিয়োগ আদেশ অনুযায়ী তা মানার কথা উল্লেখ করে ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, ভোজ্যতেল ও চিনির প্রকৃত মূল্য কত, জাতীয় তদারক কমিটির কাছে তা স্পষ্ট নয়
৩১৬ সাপের সঙ্গে বসবাস
বাগাতিপাড়ার ফাগুয়ার দিয়াঢ় গ্রামের উজ্জল খাঁর ছেলে সাপুড়ে কালু (২৭) ৩১৬টি বিষধর সাপের সঙ্গে বসবাস করছেন। বিষয়টি অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, টিনের চালা ও বেড়া দিয়ে নির্মিত নিজ শয়নকক্ষের মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা অনেকগুলো কাঠের বাক্স, মাটির পাত্রে ৩১৬টি বিষধর সাপ নিয়ে স্ত্রী নাছিমা ও এক সন্তান রাকিবুলকে নিয়ে বসবাস করছেন তিনি। বাক্স ও মাটির পাত্র থেকে সাপ বের হয়ে যাতে ঘর থেকে পালাতে না পারে সেজন্য ঘরের ভেতরে রেখেছেন লাকড়ি (জ্বালানি কাঠ)। তার বিশ্বাস সাপ পাত্র থেকে বের হলে ঘরের বাইরে না গিয়ে লাকড়ির ভেতরে পালাবে। শুরুতে তিনি বিভিন্ন এলাকা থেকে ধরে আনা বিষধর সাপ পালন করতেন। এখন পালিত সাপের ডিম থেকে বাচ্চা ফুটিয়ে তৈরি করেছেন নিজস্ব খামার। বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়ামিন খান ২০১০ সালের ১২ ডিসেম্বর তাকে দক্ষ সাপুড়ে হিসেবে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন। খামারে পালিত সাপ সহকর্মী সাপুড়েদের কাছে বিক্রি কোনোমতে খেয়ে না খেয়ে জীবণ ধারণ করছে সাপুড়ে কালুর ৫ সদস্যের পরিবার।
নাটোর সদর থেকে আনুমানিক ১২ কিলোমিটার দূরে বাগাতিপাড়া উপজেলার ফাগুয়ার দিয়াঢ় গ্রামের হতদরিদ্র উজ্জল খাঁর ২ ছেলে ১ মেয়ের মধ্যে সবার বড় কালু লেখাপড়া করেননি। শুধু নিজের নাম-স্বাক্ষর করতে পারেন। নিজ বাড়িতে সাপ লালন-পালনের খবরে তার বাড়িতে অসংখ্য উত্সুক মানুষের ভিড় লেগেই আছে। তবে শুক্রবার ছাড়া সাপুড়ে কালুকে পাওয়া যায় না। সাপ ধরতে, সাপের জন্য এমনকি নিজের ও পরিবারের জন্য খাবার সংগ্রহে সপ্তাহের ৬ দিন কালুকে ব্যস্ত সময় কাটাতে হয়। শুধু শুক্রবার সাপগুলোকে গোছল করিয়ে দুধ, কলা, মাছ, ব্যাঙ খাওয়ানোর কাজটা করেন। এসব দেখতে দর্শনার্থীরা শুক্রবার তার বাড়িতে ভিড় করে। বিকালে তিনি নিজ বাড়ির উঠানে দর্শনার্থীদের সাপের খেলা দেখান। নিজ বাড়ির বাইরে সাপের খেলা দেখান না তিনি। সাপুড়ে কালু বলেন, বাবা-মার অভাবের সংসারে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছিল তার। অভাবের তাড়না থেকে মুক্তির জন্য ১০-১২ বছর বয়সে যখন জীবিকার জন্য নানা জায়গায় ছুটছিলেন, তখন দেখা হয় গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের বাজিনাপাড়ার সাপুড়ে খাজার সঙ্গে। তার আশ্রয়ে ১৫ বছর বয়সে সাপ ধরার কৌশল শেখেন। দুই বছরের প্রশিক্ষণ শেষে ১০ বছর ধরে নিজ বাড়িতে সাপ প্রতিপালন করছেন। শুরুতে তিনি বিভিন্ন স্থান থেকে সাপ ধরে বিক্রি করতেন। পরে সাপের ডিম থেকে বাচ্চা ফুটিয়ে বড় করে তিনি সহকর্মী সাপুড়েদের কাছে বিক্রি করেন।
তিনি জানান, ৬ মাস আগে ৫৫টি গোখরা (বিষধর কুলিম) সাপের ডিম থেকে বাচ্চা ফুটিয়েছেন। এখনো তিনি সপ্তাহের ৬ দিন বিভিন্ন অঞ্চলে সাপ ধরেন। আগে নিজেই সাপ খুঁজে ধরতেন। এখন পরিচিতির কারণে প্রতিদিনই মানুষ মোবাইল ফোনে সাপ ধরার জন্য ডেকে নেয়। তার খামারে দাঁড়াস, গোখরা, মেছোসহ বিভিন্ন প্রজাতির ৩১৬টি বিষধর সাপ রয়েছে। প্রতিটি সাপ তিনি সহকর্মী সাপুড়েদের কাছে ১৫০ থেকে ২শ’ টাকায় বিক্রি করেন। সাপ বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়ে বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটান। কোনো সপ্তাহে সাপ বিক্রি না হলে সাপের খাবারের পাশাপাশি নিজেদের খাবার সংগ্রহের জন্য ভ্যান চালাতে হয়। অভাবী সাপুড়ে কালু সাপেকাটা মানুষের চিকিত্সা করেন না। এর জন্য ডাক্তারি চিকিত্সাকেই বাস্তবসম্মত বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তাই কাউকে সাপে কাটলে দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেন। একই সাথে তিনি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সাপ না মারার পরামর্শ দেন। আর্থিক সহায়তা পেলে খামারটি বড় করার ইচ্ছা আছে বলে জানান তিনি।
ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনি: প্রাণ গেল ছয় ছাত্রের
ডাকাত সন্দেহে ছয় ছাত্রকে পিটিয়ে মেরেছে গ্রামবাসী। এ ঘটনায় আহত এক তরুণের অবস্থাও গুরুতর। গত রোববার গভীর রাতে রাজধানীর উপকণ্ঠে আমিনবাজারের বরদেশী গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত ছয়জনের মধ্যে তিনজন মিরপুর বাঙলা কলেজের ছাত্র, একজন তেজগাঁও কলেজের, একজন ইংরেজি মাধ্যম স্কুল ম্যাপললিফের ও একজন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সবাই মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান।
আহত তরুণ আল-আমিন পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় গতকাল প্রথম আলোকে জানায়, শবে বরাতের নামাজ শেষে তারা নেশা করতে গিয়েছিল আমিনবাজার ট্রাক টার্মিনালের পেছনের এলাকায়। হঠা ৎ শত শত লোক ‘ডাকাত ডাকাত’ বলে চি ৎ কার করে তাদের ধাওয়া দেয়। একপর্যায়ে তাদের ধরে গণপিটুনি দিলে ছয়জন মারা যায়।
বরদেশী গ্রামের বাসিন্দারা বলেন, গ্রামের লোকজন জানতে পারে, তারা ডাকাতি করতে গ্রামে ঢুকেছে। ক্ষুব্ধ গ্রামবাসী ‘ক্যাবলার চরে’ গিয়ে তাদের পিটিয়ে মারে।
সাভার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ডাকাত সন্দেহে গ্রামবাসী যে ছয়জনকে পিটিয়ে হত্যা করেছে, তারা ডাকাত না নিরীহ ছাত্র—এটা এখনই বলা যাবে না। তদন্তের পর বলা যাবে। তবে ঘটনার পর নিহত ছয়জন ও আহত একজনের বিরুদ্ধে স্থানীয় এক বালু ব্যবসায়ী ডাকাতির মামলা করেছেন।
এদিকে ছয় ছাত্রকে হত্যার প্রতিবাদে গতকাল দারুস সালাম এলাকায় মিরপুর সড়ক দুই ঘণ্টা অবরোধ করে রাখে এলাকাবাসী। পরে স্থানীয় সাংসদ ও পুলিশের হস্তক্ষেপে তারা রাস্তা ছেড়ে দেয়।
নিহত ছাত্রদের পরিচয়: গণপিটুনিতে নিহত একজন শামস রহিম শাম্মাম (১৭)। মাস্টারমাইন্ড স্কুল থেকে ‘ও’ লেভেল শেষ করে ধানমন্ডির ম্যাপললিফে ‘এ’ লেভেলে পড়ছিল সে। তার বাবা এস এম আমিনুর রহিম সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। তিনি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলও ছিলেন। মা শামসি আরা করিমও আইনজীবী। দুই ভাইবোনের মধ্যে শামস বড়। তাদের বাসা শ্যামলীতে।
ইব্রাহিম খলিল (২১) মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক শ্রেণীর দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। তাঁর বাবা আবু তাহের কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ডে ফলের ব্যবসা করেন। দুই ভাইয়ের মধ্যে খলিল বড়। বাসা দারুস সালাম এলাকায়।
তৌহিদুর রহমান পলাশ (২০) বাঙলা কলেজের পদার্থবিদ্যা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। তাঁর বাবা মুজিবুর রহমান রেলওয়ের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তৌহিদ ছোট। বাসা দারুস সালামে।
তেজগাঁও কলেজের ব্যবস্থাপনা প্রথম বর্ষের ছাত্র টিপু সুলতান (১৯)। বাবা আবদুর রশিদ শিল্প মন্ত্রণালয়ের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী। বাসা শ্যামলীতে।
সিতাব জাবীর মুনিব (২০) মিরপুরে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউবিটি) বিবিএ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। বাবা প্রয়াত চিকি ৎ সক মোখলেসুর রহমান। এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে সিতাব বড়।
কামরুজ্জামান কান্ত (১৬) এ বছর স্থানীয় একটি মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করে বাঙলা কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়। বাবা ট্রাকচালক আবদুল কাদের সুরুজ এক বছর আগে দুর্ঘটনায় আহত হয়ে এখনো পুরোপুরি সুস্থ হননি। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে কান্ত বড়।
ঘটনাস্থল: ঢাকা থেকে সাভারে যাওয়ার পথে আমিনবাজার সেতুর ওপর থেকে বাঁয়ে তাকালেই ট্রাক টার্মিনাল। তার পেছনে ‘ক্যাবলার চর’। এটি আসলে চর নয়। বালু ফেলে নিচু এলাকা ভরাট করায় মানুষ এই নাম দিয়েছে। ট্রাক টার্মিনালের পাশে সরু গলির গ্রাম বরদেশী। এখানে কোনো বড় রাস্তা নেই। কিছু ট্রাক আর এস্কাভেটর (মাটি খোঁড়ার যন্ত্র) ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে এলাকাজুড়ে। এর পাশেই তুরাগ নদ। রোববার রাত পৌনে দুইটায় এই গ্রামের মানুষ পিটিয়ে হত্যা করে ছয় তরুণকে।
গতকাল ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ভাঙা বাঁশের টুকরো, গাছের ডাল ভাঙা, ইটের টুকরা, একটি জিনসের প্যান্ট, একটি লাল-হলুদ পাঞ্জাবি, স্যান্ডো গেঞ্জি, কয়েকটি স্যান্ডেল। এলাকাবাসী জানায়, বৃষ্টির কারণে রক্তের দাগ মুছে গেছে।
আহত আল-আমিনের মুখে ঘটনার বর্ণনা: আল-আমিন একটি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে। এর পাশাপাশি সে দারুস সালামের একটি স্কুলে নবম শ্রেণীতে পড়ে। প্রথম আলোকে সে বলে, কান্ত ও পলাশ তার পাড়ার বন্ধু। তারা তিনজনে মিলে রাতে দারুস সালামের ফুরফুরা মসজিদে শবে বরাতের নামাজ পড়তে যায়। তারা সারা রাত ঘরের বাইরে থাকবে বলে মা-বাবার কাছ থেকে অনুমতি নেয়। তাই কোথাও আড্ডা দেওয়ার পরিকল্পনা করছিল তারা। এ সময় পলাশের মুঠোফোনে তার বন্ধু টিপু সুলতান ও শামস ফোন করে। ট্রাক টার্মিনালের পাশে গাঁজা সেবন করতে যাওয়ার প্রস্তাব দেয় টিপু। সবাই এ প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়। শ্যামলী থেকে টিপু ও শামস আসে। অন্য দুজন দারুস সালাম থেকে এসে মূল সড়কে মিলিত হয়।
আল-আমিন বলে, ‘আমরা সাত বন্ধু রাত একটার দিকে রিকশায় দারুস সালাম থেকে গাবতলী পর্বত সিনেমা হলের সামনে নামি। এরপর হেঁটে আমিনবাজার ব্রিজ পার হয়ে বরদেশী বালুর মাঠে (ক্যাবলার চর) এসে থামি। কিন্তু কোথায় গাঁজা পাওয়া যাবে, খুঁজতে খুঁজতে রাত দেড়টা বেজে যায়। একপর্যায়ে লোকজন “ডাকাত ডাকাত” চি ৎ কার শুরু করে। এ সময় ভয়ে দক্ষিণ দিকে ক্যাবলার চরের দিকে দৌড় দিই। আমরা ভেবেছিলাম, গ্রামের বাইরে চলে গেলে লোকজন আসবে না। কিন্তু ফল হয় উল্টো। গ্রামবাসী চি ৎ কার শুরু করলে শত শত লোক টর্চলাইট ও লাঠি হাতে ছুটে আসতে থাকে। শুরু হয় মারধর।’
আল-আমিন জানায়, গ্রামবাসী তাদের সাতজনকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে এলোপাতাড়ি পেটাতে থাকে। পরে পুলিশ এসেও তাদের বাঁচাতে পারেনি। পুলিশের সামনেই গ্রামবাসী তাদের পেটাতে থাকে।
আল-আমিন যেভাবে বেঁচে গেল: আল-আমিন বলে, ‘একপর্যায়ে আমি এক মুরব্বির পায়ে ধরে বলি, আমরা ডাকাত না, ঘুরতে এসেছি। তবু ওই মুরব্বি নির্দয়ভাবেই আমাকে মারতে থাকেন। এরপর আমি আরেক মুরব্বির পায়ে ধরে বলি, চাচা, আমাকে বাঁচান। ওই চাচার হাত থেকে রেহাই না পেয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক দারোগার পায়ে ধরি। তখন দারোগাকে বলতে শুনি, আপনারা সবাইকে মেরে ফেললে তো সমস্যা হবে। একজনকে অন্তত বাঁচিয়ে রাখেন। এরপর লোকজন আমাকে মারা বন্ধ করে।’
আল-আমিন জানায়, তারা কেউ ডাকাত নয়, গাঁজা কিনতে ওই গ্রামে গিয়েছিল। তাদের সঙ্গে কোনো অস্ত্রও ছিল না।
ঘণ্টাব্যাপী হত্যাযজ্ঞ: পিটুনিতে অংশ নেওয়া একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানায়, তখন রাত পৌনে দুইটা বা দুইটা হবে। একদল তরুণ চর থেকে গ্রামে ঢুকছিল। তারা সংখ্যায় ১৫-১৬ জন হবে। তারা গ্রামের কিছুটা ভেতরে ঢুকে ইতস্তত ঘোরাফেরা করছিল। এতে সন্দেহ হয় গ্রামবাসীর। এরপর গ্রামবাসী ‘ডাকাত ডাকাত’ চি ৎ কার শুরু করে। একপর্যায়ে এলাকায় তিনটি মসজিদের মাইক থেকে একযোগে ‘গ্রামে ডাকাত হানা দিয়েছে’ বলে বারবার ঘোষণা দেওয়া হয়। এ সময় মসজিদে শবে বরাতের ইবাদতরত মুসল্লি, বিশেষ করে তরুণেরা ডাকাত ধরতে ছুটে যায়।
ধাওয়াকারী এক তরুণ বলে, ‘ধাওয়া খায়া হ্যারা ক্যাবলার চরে যাওয়ার পর আর কোনো রাস্তা নাই। এরপর নদী। চরের ওপর চারজনরে আমরা দ্যাখতে পাইতাছিলাম। হ্যারা মনে হয় সাঁতার জানত না। চারজনই বারবার কইতাছিল, “কাছে আইলে গুলি কইরা দিমু।” এই কথা শুইনা লোকজন আরও খেইপা যায়। এর মইদ্যে গ্রাম থিকা কয়েক শ লোক চরে আইসা জমা হয়। কিছু লোক সাঁতার দিয়া ঘুইরা চরের ওই পারে যায়। আমরা চারদিক থিকা ওগো ঘিরা ফালাই।’
এক বালু ব্যবসায়ী বলেন, চরে তখন কয়েক শ গ্রামবাসী, সবাই উত্তেজিত। অনেকের হাতে বাঁশের লাঠি। তাদের থামিয়ে রাখা যাচ্ছিল না। গুলি খাওয়ার ভয় উপেক্ষা করেই তারা চার তরুণকে ধরে ফেলে। এরপর শুরু হয় পিটুনি। গদির চালা থেকে বাঁশ খুলে, ইট নিয়ে, খুঁটির লাঠি নিয়ে যে যেভাবে পেরেছে, তাদের পিটিয়েছে।
বরদেশী গ্রামে বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসা এক নারী জানান, রাতে চি ৎ কার-চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে যায়। সবাই ভিড় করে খালের পাড়ে। সেখান থেকে এক কিলোমিটার দূরে ঘটনাস্থল। শুধু শোনা যাচ্ছিল দূর থেকে ভেসে আসা শব্দ, ‘ধর ধর মার’, ‘মাইরা ফালা’, ‘যেন বাঁচতে না পারে’, ‘বাকিগুলানরে খুঁজতে লাগ’।
বাঁচার আকুতি: প্রত্যক্ষদর্শী এক মুদি দোকানদার জানান, মারার সময় একজন বারবারই বলছিল, ‘আমি ডাকাত না, ঘুরতে আইছি।’ আরেকজন বলছিল, ‘ভাই মাইরেন না, আমি ডাকাইত না। নামাজ পইড়া ঘুরতে আইছি গাঁজা খামু বইলা’। আরেকজন বলছিল, ‘ভাই আমরা দারুস সালাম মহল্লার পোলাপাইন, আমাগোরে বাঁচান, আমরা ডাকাইত না’।
এলাকাবাসীর দাবি, একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ১৫-১৬ জন ওই এলাকায় ডাকাতি করতে এসেছিল। তাদের বেশির ভাগ পালাতে পারলেও সাতজনকে তারা আটকে ফেলে।
দারুস সালামে কান্নার রোল: নিহত ছয়জনের মধ্যে তিনজনের বাসা রাজধানীর দারুস সালাম এলাকায়। নিরপরাধ শিক্ষার্থীদের এই মৃত্যুর কঠিন আঘাত মেনে নিতে পারছিলেন না এলাকার স্বজনেরা। অনেকে তাদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। নিহত তরুণদের বাসায় বাসায় কান্নার রোল। এলাকার লোকজন ও থানা সূত্র জানায়, এই তরুণদের বিরুদ্ধে কখনো কোনো সন্ত্রাসী কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ শোনা যায়নি।
নিহত পলাশের ছোট বোন কলেজছাত্রী খুকুমণি বিলাপ করে বলছিল, ‘ওই ভাই রে, তুই ওখানে গেলি কেন। ওই খানে না গেলে তো লাশ হয়ে ঘরে ফিরতি না। যারা তোদের মিথ্যা অপবাদ দিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করল, তাদের কঠিন বিচারের ব্যবস্থা করেন আপনারা।’ পাশেই আরেক কক্ষে মা সুমি বেগমের বিলাপ, ‘ওরা আমার বুক খালি কইরা দিচেরে।’
নিহত ইব্রাহিমের চাচা আবদুল বারেক জানান, দুই ভাইবোনের মধ্যে ইব্রাহিম বড়। তার বাবা আবু তাহের কল্যাণপুরে ফলের ব্যবসা করেন। মাদারীপুরের কালকিনির পূর্ব খানদলীর কাজিবাকাই গ্রামে তাদের পৈতৃক নিবাস। আবু তাহের বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে ছেলের কলেজের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। রোববার রাত ১২টার দিকে পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে নামাজের জন্য সে বের হয়। আর ফিরল লাশ হয়ে…।’
নিহত তৌহিদের বাবা কথা বলতে পারছিলেন না। কথা বলতেই তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
প্রতিবাদ-বিক্ষোভ: ছয় ছাত্রের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে গতকাল দুপুর ১২টার দিকে দারুস সালাম এলাকাবাসী রাস্তায় নেমে এসে মিরপুর সড়ক অবরোধ করে। একই সময় বাঙলা কলেজের সামনে ছাত্ররা কিছু সময়ের জন্য সড়ক অবরোধ করে। কিছুক্ষণ অবরোধের পর ছাত্ররা দারুস সালামে এসে এলাকাবাসীর সঙ্গে যোগ দেয়।
দুপুর দেড়টার দিকে স্থানীয় সাংসদ আসলামুল হক ও পুলিশের মিরপুর বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অবরোধস্থলে আসেন। সাংসদ আসা মাত্রই তাঁকে ঘিরে ধরে ‘বিচার চাই, বিচার চাই’ বলে চি ৎ কার শুরু করে এলাকাবাসী। সাংসদ বিচারের আশ্বাস দিলে বেলা পৌনে দুইটার দিকে ওই রাস্তায় যান চলাচল শুরু হয়।
পুলিশের বক্তব্য: সাভার থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আনোয়ার হোসেন ওই রাতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে মধুমতি মডেল টাউনের কাছে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি থানার ওয়্যারলেসের মাধ্যমে খবর পেয়ে রাত দুইটার দিকে ঘটনাস্থলে যান। সেখানে তিনি চার-পাঁচ শ এলাকাবাসীর ঘেরাও করা অবস্থায় ছয়টি লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। এরপর তিনি আল-আমিনকে জীবিত উদ্ধার করে দ্রুত সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।
মামলা: এ ঘটনায় সাভার থানায় দুটি মামলা হয়েছে। একটি মামলা করেন বরদেশী গ্রামের বালু ব্যবসায়ী আবদুল মালেক। তিনি অভিযোগ করেন, হতাহত তরুণেরা রোববার রাতে ক্যাবলার চরে তাঁর বালুর গদিতে গিয়ে পাঁচ হাজার টাকা লুটে নেয়। এরপর পাশের একটি গদিঘরে গেলে তিনি চি ৎ কার দেন। এ সময় গ্রামের লোকজন এসে তাদের আটক করে পিটুনি দিলে ছয়জন মারা যায়। অপর মামলার বাদী এসআই আনোয়ার হোসেন। ছয় খুনের ঘটনায় তিনি অজ্ঞাতনামা পাঁচ-ছয় শ লোককে আসামি করেছেন।
রূপকথার মতোই জেগে উঠলো নদী!পানি দেখতে হাজার হাজার মানুষ
নদী
রূপকথার গল্পের মতোই কয়েক দশক আগে হারিয়ে যাওয়া পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় কাজলদিঘী তেলীপাড়া গ্রামের সুই নদী আবার জেগে উঠেছে। ভরাট হয়ে যাওয়া নদী শুধু আকস্মিকভাবে ফিরেই আসেনি নতুন করে প্রায় ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৬ থেকে ৭ ফুট প্রশস্ত সে াতধারাও প্রবল বেগে বইতে শুরু করেছে। অনেক আগে এই নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় নদীর বুকে পাট, আমনসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ করে আসছিল স্থানীয়রা। মূল নদী হারিয়ে যাওয়ার পরও অবশ্য সরু খালের মতো একটি সে াতধারা ছিল। এর দু’পাশেই ফসল আবাদ করা হতো। কিন্তু হঠাত্ করে পাটক্ষেত চৌচির হয়ে হারিয়ে যাওয়া সুই নদীর পুনরুজ্জীবনের ঘটনায় মানুষের মাঝে ব্যাপক কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই এ ঘটনাকে অলৌকিক মনে করছেন। প্রতিদিনই আশপাশের গ্রামসহ দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে ভিড় জমাচ্ছেন তেলীপাড়া গ্রামে। হারিয়ে যাওয়া নদী হঠাত্ করে কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে এ নিয়ে মানুষের বিস্ময়ের সীমা নেই।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন— গত ১৪ জুলাই রাতে হারিয়ে যাওয়া নদীর বুকে চাষ করা পাটক্ষেতে বিকট শব্দ হয় এবং বড় গর্তের সৃষ্টি হয়।
সকালে লোকজন গিয়ে দেখেন যে, জায়গাটিতে নদী ছিল সেখানে পুরো নদীর মতোই উজানের পানি প্রবল স্রোতে বয়ে যাচ্ছে। গত তিন দিনে সরু খালের দু’পাশের পাটক্ষেত ভেঙে প্রবল সে াতের পানি প্রবাহ নদীতে রূপ নেয়। উত্সাহী যুবক-কিশোররা নদীতে নেমে বুক সমান পানির নিচ থেকে কুড়িয়ে পাওয়া পাথর ওপরে তুলে আনন্দ করছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, প্রায় ৩ কিলোমিটার দক্ষিণে এই স্রোতধারা গিয়ে মিশেছে মূল সুই নদীতে। সুই নদী আর কুরুম নদীর যৌথ স্রোতধারা উপজেলার ঘোড়ামারা এলাকায় গিয়ে করতোয়া নদীতে মিশেছে।
স্থানীয় বৈরাগী পাড়া গ্রামের অশোক চন্দ্র রায় (৭০) জানান, তার বাবা তাকে বলেছিলেন এখানে একসময় সুই নদীর প্রবাহ ছিল। উত্পত্তিস্থল ভারত থেকে এসে এই নদী তেলীপাড়া গ্রামের ওপর দিয়ে গিয়ে করতোয়ায় মিশেছিল। তিনি জানান, গত তিন দিনের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে সেই সুই নদী আবার জেগে উঠছে।
কাজলদিঘী তেলীপাড়া গ্রামের কৃষক হাফিজুল জানান, দুই বিঘা জমিতে তিনি পাট লাগিয়েছেন। কিন্তু গত তিন দিনে এই পাটক্ষেত ভেঙে নদীতে তলিয়ে গেছে। নদীর পার্শ্ববর্তী সীতাপাড়া গ্রামের জানেবালা (৬০) ও তীলশ্বরী (৩৫) জানান, বিয়ের পর থেকেই তারা এ জায়গায় গরু-ছাগল চড়াতেন। গত বছর এখানে রোপা আমন ধান চাষ করা হয়েছে।
পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজের ভূগোল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল বারী বাবু জানান, ভূগর্ভের অভ্যন্তরে পানির চাপ বৃদ্ধি পেলে মাটি ফেটে পানি বেরিয়ে আসতে পারে। আবার উজানে বৃষ্টিপাত হলে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত এ অবস্থা বিরাজ করতে পারে। এ ছাড়া পূর্বে এখানে নদী থাকলেও এমন অবস্থা সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে ঠিক কি কারণে এ ঘটনা ঘটেছে তা এই মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়।
