Archive for ‘দেশ-ও-রাজনীতি’

July 15th, 2011

ব্যবসায়ীদের নতুন কৌশল: রোজার আগেই বাজার চড়া

রমজান মাস শুরুর আগেই বিভিন্ন পণ্যের দর বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ওই সময় বেশি ব্যবহূত হয়, এমন সব পণ্যের দাম এরই মধ্যে প্রায় সর্বোচ্চ পরিমাণে বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা এবার নতুন কৌশল নিয়েছেন। রমজান মাসে বাড়ানো হলে সমালোচনা হয় বলে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়িয়ে নিয়েছেন বেশ আগেই। দাম এমনভাবে বাড়ানো হচ্ছে যে রমজান শুরু হলে আর বাড়ানোর প্রয়োজনই পড়বে না। যুক্তি হিসেবে ব্যবসায়ীরা দেখাচ্ছেন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার সেই পুরোনো অজুহাত। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হরতাল ও বৃষ্টি।
ঈদের সময় চাকরিজীবীরা বোনাস পেলেও রমজান মাসের জন্য বাড়তি আয়ের কোনো সুযোগ নেই। বরং নিত্যপণ্যের দাম রমজানে এতটাই বাড়ছে যে বাজেট সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সীমিত আয়ের মানুষের। রমজান মানেই যেন ব্যবসায়ীদের বাড়তি আয়ের বিশেষ সুযোগ।
টিসিবির পণ্য বিক্রির গতানুগতিক আশ্বাস ছাড়া এবার সরকারের পক্ষ থেকেও জোরালো তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই। ভোজ্যতেল ও চিনি বিক্রিতে পরিবেশক নিয়োগের সিদ্ধান্তের পর পণ্য দুটির দর আরও বেড়েছে। রমজানের অপরিহার্য পণ্য ছোলার দাম বাড়ছে প্রতিদিনই। দাম কমছে এমন পণ্যের তালিকা প্রায় শূন্য।
রমজান মাস শুরু হতে আরও ১৭ দিন বাকি। দাম বাড়াতে ব্যবসায়ীদের হাতেও রয়েছে এই ১৭ দিন। এরপর রোজা শুরু হলে নতুন করে দাম বাড়ানোর প্রয়োজন পড়বে না বলে সরকারও বলতে পারবে, রমজানে বাজার স্থিতিশীল।
বাণিজ্যমন্ত্রী মুহাম্মদ ফারুক খান এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যমূল্য বাড়বে না। শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারাও রমজানে পণ্যমূল্য বাড়াবেন না বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে গিয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছেন।
কিন্তু বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। কারওয়ান বাজারের খুচরা দোকানে গতকাল বৃহস্পতিবার প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে এসেছিলেন চাকরিজীবী আবদুর রশিদ। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, গত কয়েক দিনে চিনি, তেল, ডাল ও চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। দাম বাড়ার জন্য সরকারকে দায়ী করে তিনি বলেন, সরকার যদি তদারকি বাড়ায়, তাহলে ব্যবসায়ীরা চাইলেও দাম বাড়তে পারবেন না।
গৃহিণী আসমা খাতুন বলেন, ‘এখনই যদি এভাবে দাম বাড়তে থাকে, তাহলে রমজান মাসে তো কোনো কিছুই কেনা যাবে না।’
বিভিন্ন পণ্যের দর বাড়ার তথ্য পাওয়া যায় সরকারি বিক্রয়কারী সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ওয়েবসাইটেও। টিসিবির তথ্যমতে, গত এক মাসে চাল, চিনি, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, ছোলা, ডাল, মসলাসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম কয়েক দফা বেড়েছে।
এর মধ্যে ভোজ্যতেলের ওপর মূল্য সংযোজন কর (মূসক) দুই দফা প্রত্যাহার করা হয়েছে। চিনির ওপরও প্রত্যাহার করা হয়েছে আগেই। এ জন্য সরকারকে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ছাড় দিতে হলেও সাধারণ ভোক্তারা এর কোনো সুবিধা পাচ্ছে না। ব্যবসায়ীরাই এতে কেবল লাভবান হয়েছেন।
যোগাযোগ করলে মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি আবদুর রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, যেসব পণ্যের দাম বেড়েছে, তা স্বাভাবিক কারণেই বেড়েছে। এখানে ব্যবসায়ীদের কোনো কৌশল নেই।
মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল গতকাল রাতে মুঠোফোনে বলেন, আগামী রমজানে পণ্যমূল্য বাড়বে না। তবে ডলারের দাম যদি বেশি বেড়ে যায়, তাহলে ভিন্ন কথা। মোস্তফা কামাল আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী রমজানে মুনাফা তো করবই না, প্রয়োজনে লোকসান দিয়ে হলেও পণ্য বিক্রি করব।’ ব্যবসায়ীরা এবার রমজান শুরুর আগেই দাম বাড়িয়ে নিয়েছেন—এমন প্রশ্নের জবাব দেননি তিনি।
টিসিবির সামান্য প্রস্তুতি: রমজান মাসে পাঁচটি পণ্য বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে টিসিবি। টিসিবির গুদামে যে পরিমাণ পণ্য মজুদ আছে সেটা তাদের ডিলারদের দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত মনে করছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা।
মসুর ডাল, চিনি, ভোজ্যতেল, ছোলা ও খেজুর বাজারদরের চেয়ে কম দামে বিক্রি করবে সংস্থাটি। ১৯ অথবা ২০ জুলাই এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হবে।
টিসিবির কর্মকর্তারা বলছেন, কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে রমজানের আগে হঠাৎ করে ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। অসাধু ব্যবসায়ীদের এমন প্রবণতা ঠেকাতে টিসিবি ডিলারদের কাছে পণ্য সরবরাহ শুরু করছে আগেভাগেই।
টিসিবির দুই হাজার ৪০০ ডিলার এসব পণ্য নির্ধারিত দামে বিক্রি করবেন। কেজিপ্রতি চিনি ৫৮ টাকা, মসুর ডাল (দেশি) ৬৮ টাকা, ছোলা ৫৮ টাকা, খেজুর মানভেদে ৫৫ থেকে ৭০ টাকা এবং ভোজ্যতেল লিটারপ্রতি ১০২ টাকা দরে বিক্রি করা হবে। দুই কিস্তিতে ডিলারদের এই পাঁচটি পণ্য সরবরাহ করা হবে। প্রতি কিস্তিতে একজন ডিলার দুই টন চিনি, এক হাজার ২০০ লিটার ভোজ্যতেল, এক টন মসুর ডাল, ৭০০ কেজি ছোলা ও ৫০০ কেজি খেজুর পাবেন। রমজানের প্রথম সপ্তাহে আরেক কিস্তিতে ডিলারদের পণ্য দেওয়া হবে।
প্রতি রমজানের আগেই টিসিবি বাজার স্থিতিশীল রাখতে পণ্য আমদানি ও বিক্রির নানা ধরনের আশ্বাস দিলেও তাদের মজুদ পণ্য চাহিদার সামান্যই। টিসিবি সূত্রে জানা গেছে, তাদের কাছে যে পরিমাণ পণ্যের মজুদ আছে তা দিয়ে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ বাজার-চাহিদা মেটানো সম্ভব। অবশ্য যোগাযোগ করা হলেও কী পরিমাণ পণ্য মজুদ আছে, সেই হিসাব দিতে তারা নারাজ।
চিনি: রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা দোকানে এখন চিনি বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৭২ টাকায়। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, ১৫ দিন আগেও তাঁরা ৬২ থেকে ৬৫ টাকায় চিনি বিক্রি করতেন। চিনির দাম বাড়ার কারণ পাইকারি বাজারে চলতি মাসের শুরু থেকে ক্রমাগত মূল্য বৃদ্ধি। মাসের শুরুতে মৌলভীবাজারে চিনির দাম ছিল কেজিপ্রতি ৫৯ থেকে ৬০ টাকা। তিন দিন পর দাম বেড়ে হয় ৬২ টাকা। ১০ জুন পাইকারি ব্যবসায়ীরা চিনি বিক্রি করেছেন কেজিপ্রতি ৬৬ টাকায়। আর গতকাল বিক্রি হয়েছে কেজিপ্রতি ৬৫ টাকায়। অর্থাৎ, জুলাইয়ের প্রথম ১৪ দিনে চিনির দাম পাইকারি বাজারেই বেড়েছে অন্তত ছয় টাকা।
ভোজ্যতেল: আগের বেঁধে দেওয়া দর অনুযায়ী খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হওয়ার কথা ১০৯ টাকায়। কিন্তু তা বিক্রি হচ্ছে ১১৬ টাকায়, যদিও টিসিবির তথ্যে তা ১০৭ থেকে ১১০ টাকায় দেখানো হয়েছে। বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১২৩ টাকা লিটার।
ট্যারিফ কমিশনকে ভোজ্যতেলের দর নির্ধারণের দায়িত্ব দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কয়েক দিন ধরে ট্যারিফ কমিশন এ কাজই করছে বলে জানান সংস্থাটির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার এবং তেল পরিশোধন কারখানাগুলোর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করার পর সার্বিক দিক বিবেচনা করে কয়েক দিনের মধ্যে সয়াবিন ও পামতেলের মূল্য কাঠামোর সুপারিশ করা হবে।
রমজানে চিনি ও ভোজ্যতেলের মূল্য বৃদ্ধির কোনো কারণ নেই বলে মনে করেন বাণিজ্যসচিব গোলাম হোসেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, রমজান মাস শেষ হওয়া পর্যন্ত চিনি ও ভোজ্যতেলের সরবরাহ পরিস্থিতি খুবই ভালো। চাহিদার তুলনায় এক লাখ টনেরও বেশি করে এই দুই পণ্যের অতিরিক্ত মজুদ থাকবে।
চাল: রাজধানীতে মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৩৩ থেকে ৩৫ টাকায়। নাজিরশাইল ৫৪ থেকে ৫৮, মিনিকেট ৪৪ থেকে ৪৭, পারিজা ৩৬ থেকে ৩৮, লতা ৩৬ থেকে ৩৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই চালের দাম বেড়েছে তিন থেকে চার টাকা।
বাবুবাজারের পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারি বাজারে মানভেদে চালের দাম বেড়েছে অন্তত ছয় টাকা। দাম বাড়ার কারণ হিসেবে বাবুবাজারের একজন ব্যবসায়ী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা যখন ২৬ থেকে ২৭ টাকায় চাল বিক্রি করি, তখন সরকার ২৯ টাকায় চাল কেনা শুরু করে। দাম তো বাড়বেই।’
মসলা: মসলার মধ্যে গত দুই মাসে লবঙ্গের দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। মে মাসের মাঝামাঝি যে লবঙ্গের দাম ছিল কেজিপ্রতি ৬৫০ টাকা, জুনের শুরুতে তা বেড়ে হয় এক হাজার ১০০ টাকা। গতকাল তা বিক্রি হচ্ছিল এক হাজার ৪০০ টাকায়। মে মাসে জয়ত্রী বিক্রি হতো কেজিপ্রতি দুই হাজার ৬০০ টাকায়। এখন তা বিক্রি হচ্ছে তিন হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত। একই সময়ে জায়ফলের দাম ৯০০ থেকে বেড়ে এক হাজার ১০০ টাকা হয়েছে।
এক মাসে জিরার দাম প্রায় ১০০ টাকা বেড়ে ৪৭০, দারুচিনির দাম ৩০ টাকা বেড়ে ২২০, ২০০ টাকা বেড়ে গোলমরিচ ৮০০, ৫০ টাকা বেড়ে কিশমিশ ৩৫০ টাকা হয়েছে। আর এক হাজার ৬৩০ টাকার পেস্তাবাদাম এক হাজার ৮০০, ৫৩০ টাকার আলুবোখারা ৭০০ টাকা। মসলার মধ্যে শুধু ধনিয়ার দামই সাধারণের নাগালে আছে। কেজিপ্রতি ধনিয়া বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকায়।
ছোলা ও ডাল: বাজারে ছোলা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৭২ টাকায়। এক সপ্তাহ আগে দাম ছিল ৬৫ টাকা। ডাবলি (মটর) ও নিম্নমানের অ্যাংকর ডাল বিক্রি হচ্ছে ৪২ থেকে ৪৬ টাকায়। দুই ডালের দামই এক সপ্তাহে দুই টাকা বেড়েছে।
বাজারে দেশি মসুর ডাল ৯৫ থেকে ১০০ ও বিদেশি ডাল ৭৫ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বিক্রেতারা মুগ ডাল বিক্রি করছেন ১১৫ থেকে ১২৫ টাকায়। পাইকারি বাজারে চিকন মুগ ডালের দাম এক সপ্তাহে ৯০ থেকে বেড়ে ১০৫ ও মোটা মুগের দাম ৬৮-৭০ থেকে বেড়ে হয়েছে ৭৫ টাকা।
পেঁয়াজ: বাজারে দেশি পেঁয়াজ ৩২ থেকে ৩৬ টাকা ও বিদেশি পেঁয়াজ ২৭ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বিক্রেতারা জানান, গত ১০ দিনে সব ধরনের পেঁয়াজের দামই তিন টাকা করে বেড়েছে।
শ্যামবাজারের পাইকারেরা বলছেন, দেশি পেঁয়াজের ব্যাপক মজুদ থাকলেও ভালো দাম পাওয়ার আশায় অনেক কৃষক বিক্রির পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। এ কারণে পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ আসছে না। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি বাজার থেকেই তাঁদের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
রসুন: খুচরা বাজারে চীনা রসুনের দাম ৮০ থেকে ৮৫ টাকা। কিছু দেশি রসুনও (নতুন) পাওয়া যাচ্ছে। তবে তা ১২০ টাকা কেজি। এ মাসের শুরুতে শ্যামবাজারে কেজিপ্রতি চীনা রসুনের দাম ছিল ৫০ থেকে ৫২ টাকা। ৫ জুলাই তা বেড়ে হয় ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। পরের দিন আরেক দফা বেড়ে দাঁড়ায় ৭০ টাকা পর্যন্ত।
মুড়ি: রমজান মাস আসছে, তাই বেড়েছে মুড়ির দামও। মেশিনে বানানো মুড়ি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়। আর হাতে ভাজা প্যাকেট মুড়ির দাম ৯০ থেকে ১০০ টাকা। বাজারে গত ১০ দিনে মুড়ির দাম বেড়েছে কেজিতে ছয় থেকে ১০ টাকা।
এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি এ কে আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, রমজানে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার কোনো কারণই নেই। ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনে মুনাফা না করে পণ্য বিক্রি করবেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাঁরা এমন আশ্বাসই দিয়ে এসেছেন।

July 10th, 2011

নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে: নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বাড়েনি

সংবিধান সংশোধনের সময় সরকারের পক্ষ থেকে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প হিসেবে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে ইসির ক্ষমতা বাড়েনি। নির্বাচন অনুষ্ঠানে ইসিকে আগের মতোই সরকার ও সরকারের নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভর করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, অনুগত প্রশাসন ও বাহিনী দিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে কখনো সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। আর দলীয় অনুগত নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভরশীল ইসি কখনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প হতে পারে না, বরং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল হওয়ায় ইসির ওপর সরকারের প্রভাব বাড়বে।
গত ৩০ জুন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বিল পাস হয়েছে। এর মাধ্যমে বিলুপ্ত হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। অর্থাৎ আগামী সংসদ নির্বাচন হবে দলীয় সরকারের অধীনে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও সমমনা দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিইসি এ টি এম শামসুল হুদা বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হয়েছে। এরপর কী হবে, তা দেখতে আমাদের অপেক্ষায় থাকতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘ইসির ক্ষমতা বাড়ানোর সব কর্তৃত্ব সরকারের। এ বিষয়ে সরকার আমাদের কাছে কোনো আইডিয়া চাইলে আমরা দেব। তার আগে বিষয়টি নিয়ে মতামত দেওয়ার মতো অবস্থা আপাতত নেই।’
এ ছাড়া সংবিধানের নির্বাচন-সংক্রান্ত অনুচ্ছেদগুলোতে কিছু সংশোধনী আনা হয়েছে। ১১৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং সর্বোচ্চ চারজন কমিশনার নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে। ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সংসদের মেয়াদ পূর্তির পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে। ১২৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশনকে যুক্তিসংগত নোটিশ ও শুনানির সুযোগ না দিয়ে কোনো আদালত নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনো আদেশ বা নির্দেশ দিতে পারবেন না।
সংবিধান সংশোধনের আগে বিশেষ কমিটির কো-চেয়ারম্যান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছিলেন, সংসদের মেয়াদ পূর্তির ৯০ দিন আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাজ শুরু হবে। সরকার এবং সরকারের মন্ত্রীরা তখন শুধু রুটিন কাজ করবেন। নীতিনির্ধারণী কাজ করবে নির্বাচন কমিশন। প্রয়োজনে স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ইসির হাতে দেওয়া যেতে পারে।
কিন্তু সংশোধিত সংবিধানের কোথাও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। নির্বাহী বিভাগের দায়িত্ব ইসির কাছে ন্যস্ত করার বিষয়েও কিছু বলা হয়নি।
এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরো ধারণাটাই শুভংকরের ফাঁকি। কারণ প্রশাসন ও সরকারের বাহিনী নিরপেক্ষভাবে কাজ না করলে ইসিকে হাজার ক্ষমতা দিলেও কোনো কাজ হবে না। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সবার আগে দলনিরপেক্ষ প্রশাসন ও বাহিনী দরকার। কিন্তু সংবিধানে সেই সুযোগ কোথাও রাখা হয়নি।
যোগাযোগ করা হলে নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী শাহ্দীন মালিক বলেন, আক্ষরিক অর্থে সংবিধান সংশোধনের ফলে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বাড়েনি। বরং তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হওয়ায় কমিশনের ওপর রাজনৈতিক সরকারের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কমিশনের ক্ষমতা বাড়াতে হলে সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কমিশনার নিয়োগের বিধি তৈরি করতে হবে। যাতে কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো বিতর্ক না হয়। একই সঙ্গে নির্বাচনের সময় সরকারি কর্মচারীদের শৃঙ্খলা বিধি প্রয়োগের ক্ষমতা ইসির হাতে ন্যস্ত করতে হবে, যাতে সরকার ইসির অমতে কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে বদলি বা পদোন্নতি দিতে না পারে। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও ইসি নিজেদের মতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
কমিশন সচিবালয়ের সূত্রমতে, সংবিধান সংশোধনের আগে থেকেই সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট আইনে কমিশনকে যে ক্ষমতা দেওয়া আছে, তা সরকার কখনোই পুরোপুরি মেনে চলেনি। সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সব নির্বাহী কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। ১২০ অনুচ্ছেদে বলা আছে, নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনের চাহিদামতো প্রয়োজনীয় জনবল সরবরাহ করা সরকারের দায়িত্ব।
কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হবিগঞ্জ-১ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের উপনির্বাচন এবং ১২টি পৌর নির্বাচনের জন্য ইসি সরকারের কাছে সেনাবাহিনী মোতায়েনের অনুরোধ জানিয়েছিল। সরকার সেনাবাহিনী মোতায়েন করেনি। এমনকি ইসির চিঠির উত্তরও দেয়নি। এ নিয়ে তখন কমিশনের বৈঠকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও দুই কমিশনার ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৪৪(ই) বিধান অনুযায়ী, তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনী ফল ঘোষণার পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের অনুমতি ছাড়া জেলা জজ, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের বদলি করা যাবে না। অতীতে সরকার এই আইনটিও মেনে চলেনি। সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কমিশনার নিয়োগের বিধি প্রণয়নের প্রস্তাব করে ইসি থেকে দুই দফায় সরকারের কাছে এই আইনের খসড়া পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ৩৯ বছর ধরে আইনটি হয়নি।
এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ইসি সংবিধান সংশোধন কমিটির কাছে প্রস্তাব করেছিল, নির্বাচনের সময় জনপ্রশাসনে বদলিসহ নির্বাচন-সম্পর্কিত সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কমিশনের সঙ্গে পরামর্শ করার বিধান সংবিধানে যোগ করতে হবে। কিন্তু কমিটি ইসির সেই সুপারিশ আমলে নেয়নি। জাতীয় পার্টি, জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টির প্রস্তাবে সাংবিধানিক পদে নিয়োগের জন্য একটি নির্বাচক কমিটি (সার্চ কমিটি) গঠনের সুপারিশ করা হয়েছিল। কমিটি সেই সুপারিশও গ্রহণ করেনি। এ অবস্থায় সরকার নির্বাচনের সময় নির্বাহী বিভাগের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা থেকে কতটা বিরত থাকবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে বলে ইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন।
সাবেক আইনমন্ত্রী সরকারি দলের সাংসদ আবদুল মতিন খসরু বলেন, নির্বাচনের ৯০ দিন আগে থেকে সরকারের দায়িত্ব কতটা সংকুচিত হবে এবং নির্বাহী বিভাগের দায়িত্ব কতটা নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত করা যায়, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে। একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প হিসেবে অন্য কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় কি না, সে সুযোগও আছে। এ জন্য বিরোধী দলকে সংসদে আসতে হবে। এ ছাড়া ইসির ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য কমিশনার নিয়োগের বিধিটিও দ্রুত প্রণয়ন করতে হবে।

July 9th, 2011

 নতুন-পুরোনো বরাদ্দের চক্রে এডিপি

রেলওয়ে অবকাঠামোতে বিনিয়োগ হতে পারে এডিপির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) নিয়ে নানা ধরনের ফাঁকফোকর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। বছর বছর এডিপির আকার বাড়ানো হয়। বড় আকারের এডিপি গ্রহণ করে ক্ষমতাসীনেরা বলেন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাড়ছে। আর আমলারা বলেন, এডিপি বাস্তবায়নে সক্ষমতা বেড়েছে।
আবার প্রতিবছর রাজনৈতিক বিবেচনায় বছরের শেষদিকে নতুন নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়। এতে পরবর্তী বছরের এডিপিতে নতুন প্রকল্পে বরাদ্দ দিতে হিমশিম খেতে হয়। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নতুন প্রকল্প নেওয়ার সুযোগ কমে আসে।
আবার বরাদ্দ কম দিয়ে নতুন প্রকল্প নিতে হয় বিভিন্ন পক্ষকে সন্তুষ্ট করতে। এতে করে চলমান পুরোনো প্রকল্পেও পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়া যায় না। ফলে বছর শেষে সমাপ্ত প্রকল্পের সংখ্যা কমে যায়, মেয়াদ বাড়িয়ে আবারও বরাদ্দ দেওয়া সেসব প্রকল্পে। এভাবে প্রকল্প চলে বছরের বছরের পর। এক ধরনের চক্রের মধ্যে পড়ে যায় পুরো এডিপি ব্যবস্থাপনা।
এ নিয়ে সম্প্রতি পরিকল্পনামন্ত্রী এ কে খন্দকারের সভাপতিত্বে পরিকল্পনা কমিশনের সভায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়।
সদ্য বিদায়ী ২০১০-১১ অর্থবছরে সংশোধিত এডিপির আকার কমিয়ে ৩৫ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু বছরের মাঝখানে নতুন প্রকল্প ঢুকেছে ২৭০টি। আর এসব নতুন প্রকল্প পুরোনো চলমান প্রকল্প হিসেবে দেখিয়ে চলতি অর্থবছরের এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
৪৬ হাজার কোটি টাকার নতুন এডিপিতে প্রকল্প সংখ্যা ১০৩৯। এর মধ্যে ‘নতুন’ প্রকল্প মাত্র ৭৭টি।
এভাবে প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করাকে ‘চালাকি’ ও ‘অর্থের অপচয়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) পরিচালক জায়েদ বখত। তিনি আরও বলেন, ‘নতুন প্রকল্পগুলো মূলত মন্ত্রী-এমপিদের চাপে রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া হয়। বছরের শেষদিকে এসে নেওয়া এসব প্রকল্পে তাড়াহুড়া করে অর্থ খরচ করতে গিয়ে কাজের গুণগত মান থাকে না, এটা অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়।’
এভাবে বছরের পর বছর নতুন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করার ফলে সমাপ্ত প্রকল্পের সংখ্যা তুলনামূলক কমছে। এসব ‘নতুন’ প্রকল্পে প্রতিবছর বরাদ্দ দিতে গিয়ে পুরোনো প্রকল্প সময়মতো শেষ করা যাচ্ছে না। মেয়াদ বাড়িয়ে পুরোনো প্রকল্পগুলোতে আবার বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের একটি চক্রের মধ্যে পড়েছে এডিপি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া।
আবার ঢাউস আকারের এডিপির বাস্তবতা হলো, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধিজনিত কারণে মূল্য সমন্বয়। এই মূল্য সমন্বয় করতে গিয়ে প্রকল্প ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। তাতে গুণগত কোনো পরিবর্তন হয় না।
এডিপির এই বিশৃঙ্খল অবস্থা সম্পর্কে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জায়েদ বখত প্রথম আলোকে বলেন, ‘মূল্য সংশোধনের বা সমন্বয়ের কারণে এডিপির আকার বাড়ে এটা সত্য। তবে প্রকৃত মূল্যেও এডিপির আকার বাড়ছে। এখানে সমস্যা হলো, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় এডিপির আকার কমে এসেছে। এর মানে হলো, প্রয়োজনের তুলনায় সরকারি ব্যয় হ্রাস পাচ্ছে। আর সরকারি ব্যয় কম হলে বেসরকারি বিনিয়োগও তুলনামূলক কম আকৃষ্ট হবে।’
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছরের ২৯ মে পর্যন্ত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে যেসব প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুযায়ী সেগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষা চলতি অর্থবছরের এডিপির জন্য ৬৯ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন। কিন্তু অর্থসংকটে ৪৬ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হয়নি।
পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য শামসুল আলম প্রথম আলোকে জানান, প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় প্রকল্পগুলোর মেয়াদ বাড়ানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। ফলে স্বভাবতই প্রকল্পের ব্যয় বাড়বে।
ব্যয় বৃদ্ধির নমুনা: টঙ্গী থেকে ভৈরববাজার পর্যন্ত ডবল রেলপথ নির্মাণে খরচ করা হবে দুই হাজার ৩৭ কোটি টাকা। আর ২০০৬ সালে একই প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল মাত্র ৭২০ কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করে।
নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পটি শুরু করতে না পারায় জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কারণে পাঁচ বছরের ব্যবধানে প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। গত ২০ জুন ব্যয় বাড়িয়ে প্রকল্প আবারও অনুমোদন দেওয়া হয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক)।
অনুমোদনের পর এ বিষয়ে পরিকল্পনাসচিব মনজুর হোসেন বলেছেন, ‘যখন প্রকল্পটির ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়, তখন জিনিসপত্রের দাম অনেক কম ছিল। দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অনেক সময় লেগেছে। ততক্ষণে জিনিসপত্রের দাম আরও বেড়েছে। জমি অধিগ্রহণেও আগের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ খরচ করতে হবে।’ প্রকল্পটির মেয়াদকাল বাড়িয়ে ২০০৭ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত করা হয়েছে।
এমন আরেকটি প্রকল্প হলো খুলনা ১৫০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্ল্যান নির্মাণ প্রকল্প। গত ২২ মার্চ একনেকে এক হাজার ৫৪২ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়। কিন্তু ২০০৬ সালে যখন প্রকল্পটি প্রথম অনুমোদন করা হয়, তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮০৩ কোটি টাকা।
সমস্যা হলো, দাতা সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) আর্থিক অনুমোদন পেতে সময় লাগে প্রায় পাঁচ বছর। এই সময়ের মধ্যে প্রকল্পটির জন্য আনুষঙ্গিক সব নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যায়। ফলে ২০১১ সালে প্রকল্প বাস্তবায়ন নতুন করে ব্যয় নির্ধারণ করতে হয়েছে।
দুটি প্রকল্পই ২০০৬ সালে বাস্তবায়ন শুরু হলে ব্যয় বর্তমানের অর্ধেকেরও কম হতো। কিন্তু ২০১১ সালে এসে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ব্যয় বাড়ছে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার বড় হচ্ছে। দুটি প্রকল্প বাস্তবায়নেই ব্যয় বাড়ানো হয়েছে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কারণে।
এদিকে গত পাঁচ বছরে এডিপির আকারও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে এডিপির আকার ছিল ২৬ হাজার কোটি টাকা, পরে সংশোধন করে ২১ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। ২০০১১-১২ অর্থবছরে মূল এডিপির আয়তন ধরা হয়েছে ৪৬ হাজার কোটি টাকা। গত পাঁচ বছরে এডিপির আকার কমবেশি দ্বিগুণ হয়েছে।
মূলত এডিপির প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার এক ধরনের কেনাকাটা করে। পাঁচ বছরে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ করে পূর্ত কাজের মূল উপাদান ইট, বালু, সিমেন্ট, রডসহ আনুষঙ্গিক জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। বর্তমানে এক ট্রাক ইটের দাম ১৮-২০ হাজার টাকা। পাঁচ বছর আগে এক ট্রাক ইটের দাম ছিল ১২-১৩ হাজার টাকা। রডের দাম আলোচ্য সময়ে ওঠানামা করেছে। খুচরা পর্যায়ে এখন ভালোমানের এক টন রডের দাম ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টাকা। পাঁচ বছর আগে এর দাম ছিল ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা। উল্লেখযোগ্য হারে সিমেন্টের দামও বেড়েছে।
অথচ বিভিন্ন আমলের সরকার প্রতিবারই বড় এডিপি করে বাহবা নেয়। মন্ত্রী-এমপিরা চিৎকার করে গলা ফাটান উন্নয়নের জোয়ারে দেশকে ভাসিয়ে দেওয়ার জন্য। আর আমলারা দাবি করেন, ব্যয়ের সক্ষমতা বেড়েছে।
বাস্তবতা হলো, মূল্য সমন্বয়ের জন্যই এডিপির আকার বড় করতে হয়। পাঁচ বছর আগে সাড়ে ২৬ হাজার কোটি টাকার এডিপিভুক্ত একই প্রকল্প এখন বাস্তবায়ন করতে ৪৫-৪৬ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। ঠিকাদারও বর্ধিত মূল্য ধরেই দরপত্র জমা দেন।
প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমি অধিগ্রহণেও নানা জটিলতা রয়েছে। প্রকল্পের জন্য কোনো এলাকায় ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলেই সেখানে জমির দাম বাড়তে থাকে হু হু করে। এমনকি রাতারাতি কৃষিজমিতে ঘরবাড়ি তৈরি করে বসতভিটা দেখানো হয়। ভূমি অধিগ্রহণকালে ক্ষতিপূরণ বাবদ অনেক বেশি অর্থ প্রাক্কলন করতে হয়।
এ সম্পর্কে মূল্যায়ন, পরিবীক্ষণ ও বাস্তবায়ন বিভাগের (আইএমইডি) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ‘একটি প্রকল্পের জন্য প্রস্তাবনা তৈরির সময় ভূমির যে দাম নির্ধারণ করা হয়, অধিগ্রহণকালে তা দ্বিগুণ হয়ে যায়। এর অন্যতম উদাহরণ হলো, ‘পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প।’
জিডিপি-এডিপি অনুপাত: মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে এডিপির আকার ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে না। চলতি মূল্যে হিসাব করে পাঁচ বছর আগে ২০০৬-০৭ অর্থবছরে এডিপির আকার ছিল জিডিপির ৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ। আর সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে জিডিপির ৪ দশমিক ৫৪ শতাংশই সরকারি উন্নয়ন কর্মসূচিতে ব্যয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে এই অনুপাত ৩ দশমিক ৭৪ শতাংশে নেমে এসেছিল।
এভাবে সরকারি বিনিয়োগ কম হলে সরকার যে অবকাঠামোগত সুবিধা দেয়, তাও সেভাবে বাড়বে না। অথচ এই অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়েই বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা উৎপাদন বাড়ান, যা জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সহায়তা করে।

July 5th, 2011

মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া লোক নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি হচ্ছে

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কথা শুনছে না কারা অধিদপ্তর

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো কথাই শুনছে না কারা অধিদপ্তর। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া বিভিন্ন পদে যেমন লোক নিয়োগ করা হচ্ছে, তেমনি বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রেও মন্ত্রণালয়ের ধার ধারছে না কারা প্রশাসন। মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো আটটি চিঠিতে এমন অভিযোগ করা হয়েছে।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) প্রথম আলোকে বলেন, কারা অধিদপ্তর আইন ভঙ্গ করে নিয়োগ, পদোন্নতি দিয়েই যাচ্ছে। বিভিন্ন সময় চিঠি দিয়ে এসব বিষয়ে জানতে চাওয়া হলেও তারা কোনো জবাব দিচ্ছে না।
তবে কারা মহাপরিদর্শক (আইজি) আশরাফুল ইসলাম খান উল্টো মন্ত্রণালয়কেই অভিযুক্ত করেছেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, একটার পর একটা চিঠি দিয়ে মন্ত্রণালয় হঠকারিতার পরিচয় দিয়েছে। এসব চিঠির কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।
সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে কারা প্রশাসন বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল করে। কয়েকজন কর্মকর্তাকে পদোন্নতিও দেওয়া হয়। এসব নিয়োগের মধ্যে রয়েছে ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পদের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ। গত ১ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে অভিযোগ করা হয়, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই ঢাকা ও রাজশাহী কারা উপমহাপরিদর্শক পদে কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো রকম আইন ও নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। এ ব্যাপারে কারণ দর্শাতে চিঠি দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের আরেক চিঠিতে বলা হয়, নিয়ম ভঙ্গ করে জ্যেষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক গোলাম হায়দারকে পদোন্নতি দিয়ে ডিআইজি (প্রিজন) করা হয়েছে। কিশোরগঞ্জের তত্ত্বাবধায়ক জহির উদ্দিন বাবরকে সহকারী এআইজির (প্রশাসন) চলতি দায়িত্বে দেওয়া হয়েছে। রাজশাহী বিভাগের ডিআইজি নিয়োগ করা হয়েছে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক পার্থ গোপাল বণিককে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জেলা কারাগারের জেলারের পদে উপ-জেলার পদের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে কারও অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে।
কারা সূত্র জানায়, ডিআইজি (প্রিজন) গোলাম হায়দার ২০০৯ সালের ৯ এপ্রিল থেকে কারা অধিদপ্তরে ডিআইজির পদে চলতি দায়িত্বে ছিলেন। ২০০৯ সালের মে মাসে ঢাকা বিভাগের ডিআইজি প্রিজন মেজর সাইফুল ইসলাম সেনাবাহিনীতে ফিরে যাওয়ার পর মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই গোলাম হায়দারকে এ পদে অতিরিক্ত দায়িত্বে বসানো হয় বলে উল্লেখ করা হয়।
সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয় থেকে আইজি প্রিজনের কাছে জানতে চাওয়া হয়, কারা অধিদপ্তরের ডিআইজি প্রিজন পদে চলতি দায়িত্বে থাকা গোলাম হায়দার এক ধাপ ওপরের দুটি পদে কীভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। মন্ত্রণালয় গোলাম হায়দারের দায়িত্ব পালনের আদেশও বাতিল করতে বলে।
একইভাবে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়ক পার্থ গোপাল বণিক, কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারের জেলারের চলতি দায়িত্বে থাকা জহির উদ্দিন বাবর নিজ পদের ওপরের পদে কীভাবে দায়িত্ব পালন করছেন, সে বিষয়েও মন্ত্রণালয় ব্যাখ্যা চায়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এসব চিঠির মধ্যে কয়েকজনের পদোন্নতির ব্যাপারে ব্যাখ্যা দেয় কারা প্রশাসন। এতে বলা হয়, বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক (চলতি দায়িত্বে) ছগির মিয়ার চাকরি পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। এ ছাড়া জাহাঙ্গীর কবির ও কামাল হোসেন বর্তমানে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার-১, কাশিমপুর ও সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে জ্যেষ্ঠ তত্ত্বাবধায়কের চলতি দায়িত্বে আছেন। কেন্দ্রীয় কারাগারে কারা তত্ত্বাবধায়কের পদটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সহকারী কারা মহাপরিদর্শকের পদটি সিনিয়র তত্ত্বাবধায়কের নিচের পদ। এ পদের প্রশাসনিক দায়িত্বও কম। কেন্দ্রীয় কারাগারের পদটি শূন্য থাকলে প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। এ আশঙ্কার কারণেই এসব পদোন্নতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো নিয়ম ভঙ্গ করা হয়নি বলে কারা প্রশাসনের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয় থেকে কারা অধিদপ্তরে পাঠানো চিঠিতে জানানো হয়, ছয়জন উপকারাধ্যক্ষকে পদোন্নতির ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নেওয়া হয়নি। এ ক্ষেত্রে শুধু সরকারি কর্মকমিশনের সুপারিশ নেওয়া হয়েছে। এটা সচিবালয় নির্দেশমালার পরিপন্থী বলে মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
সচিবালয় নির্দেশমালার ১৫৮ ও ১৬০ অনুচ্ছেদ বলা হয়েছে, ‘কোন মন্ত্রণালয় বা বিভাগের প্রস্তাব, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সম্মতি ছাড়া সচিবালয়ের বাইরের কোন প্রতিষ্ঠান, কর্তৃপক্ষ বা কর্মকর্তার কাছে পাঠানো যাবে না। সংস্থাগুলোর সরকারি বিষয়ের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরামর্শ নিবে।’ কিন্তু কারা প্রশাসন এ নিয়ম মানছে না।
মন্ত্রণালয়ের অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে কারা মহাপরিদর্শক (আইজি) আশরাফুল ইসলাম খান প্রথম আলোকে বলেন, গত ২৪ মে থেকে ১১ জুন পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কারা শাখা মোট আটটি চিঠি দিয়েছে। তিনি বলেন, ওই সময় তিনি দেশে না থাকায় জবাব দিতে পারেননি। তিনি অভিযোগ করেন, এসব চিঠি কর্মকর্তাদের নামে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের উচিত ছিল আইজির নামে পাঠানো। তিনি বলেন, ‘আমি যা করেছি, জেল কোডের বিধান অনুসারে স্বরাষ্ট্রসচিবের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে করেছি। আমি এসব চিঠিতে ভয় পাই না।’
মন্ত্রণালয়ের কারা শাখার উপসচিব আলম আরা বেগম অবশ্য এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

July 4th, 2011

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় সম্পূরক অভিযোগপত্র

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় সম্পূরক অভিযোগপত্র
বাবর-তারেকসহ ৩০ নতুন আসামি
…………………………………………………………………………………..
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। এতে নতুন আসামি করা হয়েছে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানসহ ৩০ ব্যক্তিকে।
আসামিদের মধ্যে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেকসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে গতকাল গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি গতকাল রোববার দুপুরে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে ২১ আগস্টের ঘটনায় দুটি মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয়।
সম্পূরক অভিযোগপত্রে আরও আসামি করা হয়েছে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, বিএনপির সাংসদ শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী ও একান্ত সচিব সাইফুল ইসলাম ওরফে ডিউক এবং বিএনপির নেতা ও ঢাকার ওয়ার্ড কমিশনার মো. আরিফুল ইসলাম।
এ ছাড়া জোট সরকারের সময়ের শীর্ষপর্যায়ের চারজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও আট পুলিশ কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে। বাকি আসামিদের মধ্যে ১০ জন জঙ্গি সংগঠনের নেতা-কর্মী ও একজন পরিবহনমালিক।
নতুন ৩০ আসামিসহ এ মামলায় মোট আসামির সংখ্যা হলো ৫২ জন। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালের ১১ জুন এ-সংক্রান্ত মামলা দুটির অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। এতে বিএনপির উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের ৩ আগস্ট ২১ আগস্ট মামলার অধিকতর তদন্তের আদেশ দেন আদালত। প্রায় দুই বছর অধিকতর তদন্ত শেষে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল কাহার আকন্দ গতকাল আদালতে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেন।
নতুন ৩০ আসামি: সম্পূরক অভিযোগপত্রের ক্রম অনুযায়ী আসামিরা হলেন: লুৎফুজ্জামান বাবর, মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম, তারেক জিয়া (অভিযোগপত্রে এভাবেই লেখা রয়েছে), হারিছ চৌধুরী, কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, মো. হানিফ, আরিফুল ইসলাম, মাওলানা শেখ আবদুস সালাম, মো. ইউসুফ বাট ওরফে মজিদ বাট, আবদুল মালেক ওরফে গোলাম মোহাম্মদ, মুফতি আবদুর রউফ ওরফে আবু ওমর, মাওলানা সাব্বির আহমেদ ওরফে আবদুল হান্নান, মাওলানা শেখ ফরিদ, হাফেজ ইয়াহিয়া, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই, বাবু ওরফে রাতুল বাবু, ঘটনার সময় মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (পূর্ব) ওবায়দুর রহমান, উপকমিশনার (দক্ষিণ) খান সাঈদ হাসান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আশরাফুল হুদা ও শহুদুল হক, জোট সরকার আমলের তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির এএসপি আবদুর রশিদ, মুন্সি আতিক ও তদন্ত তদারক কর্মকর্তা বিশেষ পুলিশ সুপার রহুল আমিন, তৎকালীন অতিরিক্ত আইজিপি (সিআইডি) খোদা বক্স চৌধুরী, লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক, লে. কর্নেল (চাকরিচ্যুত) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার ও মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন।
আসামিদের পরিচয়: ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সময় রেজ্জাকুল হায়দার প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) পরিচালক, আবদুর রহিম জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মহাপরিচালক এ টি এম আমিন পরে ডিজিএফআইয়ের পরিচালক হন। সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার জোট সরকারের আমল থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পুরো সময় ডিজিএফআইয়ের জঙ্গি দমন শাখায় কর্মরত ছিলেন। তিনি সপরিবারে বিদেশে পালিয়ে গেছেন বলে সিআইডির কাছে তথ্য রয়েছে।
আর শেখ আবদুস সালাম, হাফেজ ইয়াহিয়া, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই, শেখ ফরিদ, মুফতি রউফ ও সাব্বির হরকাতুল জিহাদের (হুজি) শীর্ষস্থানীয় নেতা। মাজেদ বাট পাকিস্তানি নাগরিক, তিনি পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের জঙ্গি সংগঠন হিজবুল মুজাহিদিনের সদস্য, আবদুল মালেক লস্কর-ই-তাইয়েবার সদস্য। রাতুল বাবু সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই ও মো. হানিফ হলেন হানিফ পরিবহনের মালিক।
গ্রেপ্তারি পরোয়ানা: আসামিদের মধ্যে ১২ জন এখন কারাবন্দী। বাকি ১৮ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। তাঁরা হলেন তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, কায়কোবাদ, এ টি এম আমিন, সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, ওবায়দুর রহমান, খান সাঈদ হাসান, আশরাফুল হুদা, শহুদুল হক, আবদুর রশিদ, মুন্সী আতিকুর রহমান, রুহুল আমিন, খোদা বখস চৌধুরী, সাইফুল ইসলাম ডিউক, মো. হানিফ, মুফতি শফিকুর রহমান, আবদুল হাই ও রাতুল বাবু। গতকাল সন্ধ্যায় মহানগর হাকিম কেশব রায় চৌধুরী সম্পূরক অভিযোগপত্র গ্রহণ করে তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আদেশ দেন।
তারেক রহমান ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অনুমতি নিয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। এখন তিনি যুক্তরাজ্যে আছেন।
এ ছাড়া বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে করা মামলার বিচার নিষ্পত্তির জন্য সম্পূরক অভিযোগপত্র মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন মুখ্য মহানগর হাকিম এ কে এম এনামুল হক।
গোয়েন্দা-সহায়তায় পালিয়েছেন তাজউদ্দিন: সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় জড়িত জঙ্গিদের নানাভাবে সহযোগিতার অভিযোগে সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের আসামি করা হয়েছে। গোয়েন্দারা তাজউদ্দিনের জন্য ‘মোহাম্মদ বাদল’ নামে রাজশাহীর ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে পাসপোর্ট তৈরি এবং বিদেশে যেতে সহায়তা করেন। তাজউদ্দিন ২০০৬ সালের অক্টোবরে ঢাকা থেকে পাকিস্তানে চলে যান। এ বিষয়ে সাবেক তিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা মেজর (চাকরিচ্যুত) সৈয়দ মনিরুল ইসলাম, লে. কর্নেল (চাকরিচ্যুত) আফজাল নাছির ভূঁইয়া, নৌবাহিনীর লে. কমান্ডার মিজানুর রহমান আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। একইভাবে ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) সাদিক হাসান রুমি, র‌্যাবের তৎকালীন কর্মকর্তা ও বর্তমানে দিনাজপুরের খোলাহাটি সেনানিবাসে কর্মরত মেজর আতিকুর রহমান সাক্ষী হিসেবে আদালতে জবানবন্দি দেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তার বক্তব্য: তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সিআইডির বিশেষ সুপার আবদুল কাহার আকন্দ গতকাল প্রথম আলোর বলেন, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে শেখ হাসিনার জনসভায় হামলার ঘটনার সঙ্গে চারদলীয় জোট সরকারের সর্বোচ্চ মহলের হাত ছিল। তদন্তে তা প্রমাণিত হয়েছে। তা ছাড়া কিছু ব্যক্তির স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে মামলাটি ভিন্ন খাতে নেওয়া হয়।
কাহার আকন্দ বলেন, জোট সরকারের আমলেই মুফতি হান্নান গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। গ্রেপ্তারের পর তিনি শেখ হাসিনার জনসভায় হামলার কথা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকারও করেন। কিন্তু তৎকালীন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সে বক্তব্য এড়িয়ে যান। তদন্তের প্রথম থেকেই পরিকল্পিতভাবে এটা করা হয়েছিল। তাজউদ্দিনের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, তৎকালীন দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা রীতিমতো পাহারা দিয়ে মামলার গুরুত্বপূর্ণ আসামি তাজউদ্দিনকে বিদেশে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেন। তাজউদ্দিনের পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি অনেকেই জানতেন। এ কারণে মামলায় ওইসব ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়েছে।
কাহার আকন্দ বলেন, শেখ হাসিনা হত্যা চেষ্টার সঙ্গে বিভিন্ন গোষ্ঠীর অনেক মানুষের হাত ছিল। এসব তথ্য উদ্ঘাটন করা ছিল বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এ কারণে সম্পূরক তদন্ত করতে দুই বছর সময় লেগেছে।
তারেক সম্পর্কে প্রধান কৌঁসুলির বক্তব্য: সম্পূরক অভিযোগপত্রে তারেক রহমানকে আসামি করার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি সৈয়দ রেজাউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, হাওয়া ভবনে জঙ্গি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে তারেক রহমান ও বাবর গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনা এবং হামলার আগে ও পরে জঙ্গিদের প্রশাসনিক সহযোগিতা করেছেন। অধিকতর তদন্তে এ ব্যাপারে সিআইডি সাক্ষ্য-প্রমাণ পেয়েছে। হাওয়া ভবন এই গ্রেনেড হামলার সাংকেতিক নাম (কোড) ব্যবহার করতেন। সেটা হলো ‘শেখ হাসিনাকে হালকা নাশতা করাবে।’
রেজাউর রহমান বলেন, আগের অভিযোগপত্রে হামলায় ব্যবহূত আর্জেস গ্রেনেডের উৎস, মজুদ, সরবরাহকারী, পরিকল্পনাকারীদের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল না। অধিকতর তদন্তে বেরিয়ে এসেছে আর্জেস গ্রেনেড পাকিস্তান থেকে আনা হয়েছে। তা পাকিস্তানি নাগরিক মজিদ বাটের মাধ্যমে সংগ্রহ করে সাবেক মন্ত্রী আবদুস সালম পিন্টু ও তাঁর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন হামলাকারীদের মধ্যে বিতরণ করেছেন। তিনি দাবি করেন, হয়রানি করার জন্য কাউকে আসামি করা হয়নি। সিআইডির তদন্তে যাঁদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণ মিলেছে, তাঁদেরই আসামি করা হয়েছে।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার জনসভায় এই গ্রেনেড হামলায় ২২ জন নিহত হন। আহত হন কয়েক শ ব্যক্তি।

June 15th, 2011

রুমানা মনজুরের স্বামী হাসান সাইদ গ্রেপ্তার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক রুমানা মনজুরকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ অস্বীকার করলেন তাঁর স্বামী হাসান সাইদ। তিনি বলেন, স্ত্রীর ই-মেইল চেক করা নিয়ে দুজনের মধ্যে হাতাহাতি হয়েছে। ওই সময় রুমানা আঘাত পেয়ে থাকতে পারে। তিনি তাঁকে হত্যার চেষ্টা করেননি।
আজ বুধবার বিকেলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে হাসান সাইদ সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। এ সময় ডিবি পুলিশের উপকমিশনার মনিরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে বেলা সোয়া দুইটার দিকে রাজধানীর উত্তর মুগদার একটি বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ।
ডিবি পুলিশের জনসংযোগ শাখার অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার মাসুদুর রহমান জানান, আজ সকালে হাসান সাইদকে খুঁজতে দুই-তিন জায়গায় অভিযান চালানো হয়। পরে সাইদ উত্তর মুগদার একটি বাসায় অবস্থান করছে বলে তাঁদের কাছে খবর আসে। এরই ভিত্তিতে ডিবি পুলিশ দুপুরে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
গত ৫ জুন ধানমন্ডির বাসায় হাসান সাইদের নির্যাতনের শিকার হন তাঁর স্ত্রী রুমানা মনজুর। পরের দিন তাঁর বাবা মনজুর হোসেন বাদী হয়ে ধানমন্ডি থানায় মামলা করেন।
গুরুতর আহত রুমানা আট দিন রাজধানী ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ছিলেন। গতকাল মঙ্গলবার তাঁকে উন্নত চিকিত্সার জন্য ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। নির্যাতনে রুমানার বাঁ-চোখ নষ্ট হয়ে গেছে এবং ডান চোখের অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে এখানকার চিকিত্সকেরা জানিয়েছেন।