বিশ্বকাপ তাঁর জন্য ছিল নায়ক হওয়ার মঞ্চ। দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন বিশ্বকাপকে তাঁর রঙে রাঙাতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হতাশার বিবর্ণ আঁধারে ঢেকে গেছেন লিওনেল মেসি। আর সেই মঞ্চে আলো ছড়িয়েছেন ডিয়েগো ফোরলান। বিশ্বকাপের আগে সম্ভাব্য নায়ক হিসেবে যাঁর নাম খুব বেশি উচ্চারিত হয়নি, সেই ফোরলানই হয়েছেন বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়। কোপা আমেরিকায় বিশ্বকাপ হতাশা ভুলতে চান মেসি। আর ফোরলানের বিরুদ্ধে হিসাব চুকানোর লড়াইটাই কি নেই!
ফুটবল এক-দুজনের লড়াই নয়। তার পরও দলীয় দ্বৈরথের কেন্দ্রে এক-দুজনই থাকেন। আর্জেন্টিনার জন্য যেমন মেসি, উরুগুয়ের জন্য তেমনি ফোরলান। মিল থাকছে আরেক জায়গায়, দুজনই কোপায় হতাশার শুরুটা গ্রুপের শেষ ম্যাচে পুষিয়ে দিয়েছেন। কোস্টারিকার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-০ জয়ের নায়ক ছিলেন মেসি, মেক্সিকোর বিপক্ষে উরুগুয়ের ১-০ গোলের জয়ে ফোরলানও তা-ই। মেসি গোল পাননি, ফোরলানও না। তার পরও পুরো দলকে এক সুতোয় গেঁথে রেখেছিলেন এই দুজনই।
এমনিতে আর্জেন্টিনা-উরুগুয়ে দ্বৈরথে আলাদা করে ব্যক্তিকেন্দ্রিক কোনো উপাদান খুঁজতে হয় না। সেখানে ইতিহাস নিজেই একটা বড় চরিত্র। ১৯১৬ প্রথম কোপার ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়েই শিরোপা জিতেছিল উরুগুয়ে, ১৯৩০ প্রথম বিশ্বকাপেও তা-ই। এখানেই শেষ নয়। নিজেদের ১৪টি কোপা শিরোপার প্রথম ৬টিই উরুগুয়ে জিতেছিল আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে। একপক্ষীয় এই লড়াইয়ের ছবিটা পাল্টেছে ১৯২৭ সাল থেকে। এরপর শিখরে উঠতে উঠতে আর্জেন্টিনার শিরোপাসংখ্যাও পৌঁছে গেছে চৌদ্দতে। তবে এরই মধ্যে আর্জেন্টিনার হূদয়ে কাঁটা হয়ে বিঁধে আছে দুটি ছবি। এর আগে আটবার কোপার আয়োজক হয়ে মাত্র দুবার তারা শিরোপা জেতেনি। দুবারই স্বপ্নের হন্তারক উরুগুয়ে। নবমবারের মতো কোপার আয়োজক আর্জেন্টিনার ভাগ্যে কি অপেক্ষা করছে একই পরিণতি?
মুখোমুখি সর্বশেষ পাঁচ লড়াইয়ের চারটিই জিতেছে আর্জেন্টিনা। তা ছাড়া নিজেদের মাঠে খেলা—এই হিসাব হয়তো স্বাগতিকদেরই এগিয়ে রাখছে। তা ছাড়া গত বিশ্বকাপের পর থেকে উরুগুয়েও কেমন জানি ঔজ্জ্বল্য হারিয়েছে ফোরলানের মতোই। কিন্তু একটা ম্যাচেই পাল্টে যেতে পারে সব হিসাব। সেই ম্যাচটা হতে পারে এটাই।
তবে খোদ উরুগুয়ে কোচ অস্কার তাবারেজও কিন্তু আর্জেন্টিনাকেই এগিয়ে রাখছেন। কারণ এই দলে যে আছে মেসি নামের আশ্চর্য এক জাদুর প্রদীপ। তার ভেতরের দৈত্যটার ঘুমও ভেঙেছে গত ম্যাচে। তবে শিষ্যদের তাবারেজ সাহস জোগাচ্ছেন এই বলে, ‘যখন মেসি-সমস্যার কোনো সমাধান নেই, এটা নিয়ে অযথা ভেবে লাভ কী? আমরা যতই চেষ্টা করি না কেন, মেসি অবশ্যই আমাদের জন্য অনেক সমস্যা তৈরি করবে। তবে আমরাও কিন্তু এমন কিছু সমস্যা তৈরি করতে পারি, যেটা মেসি কেন, কারও পক্ষেই সামলানো সম্ভব হবে না।’
উরুগুয়ের জন্য দুঃসংবাদ হলো, কোস্টারিকা ম্যাচে মেসিকে ‘মেসি’ হয়ে উঠতে দেওয়ার রসায়নটা খুঁজে পেয়েছেন আর্জেন্টিনা কোচ সার্জিও বাতিস্তা। তবে সে ম্যাচে সমস্যাও যে কিছু দেখা দেয়নি, তা নয়। গঞ্জালো হিগুয়েইনের গন্ডা খানেক সুযোগ হাতছাড়া করা নতুন করে ভাবাচ্ছে বাতিস্তাকে। তা ছাড়া কোস্টারিকা তুলনামূলক দুর্বল ছিল বলে আক্রমণভাগে হিগুয়েইন-আগুয়েরো-ডি মারিয়া-মেসি সবাইকেই রাখতে পেরেছিলেন। এবার বাতিস্তা একটু রক্ষণাত্মক হতে পারেন বলেই ইঙ্গিত। সে ক্ষেত্রে হিগুয়েইনকে আবার বসিয়ে রাখা হতে পারে। মাঝমাঠে শক্তি বাড়াতে ফিরে আসতে পারেন এস্তেবান ক্যাম্বিয়াসো। প্রথম দুই ম্যাচে ক্যাম্বিয়াসো যা খেলেছেন, তাতে এই সিদ্ধান্ত হিতে বিপরীতও হয়ে যেতে পারে। বাতিস্তা নাকি অন্য তরুণ মিডফিল্ডার লুকাস বিগলিয়াকে নিয়েও ভাবছেন। গত ম্যাচে শেষ কয়েক মিনিট খেলে বেশ নজর কেড়েছেন এই সোনাচুলো ২৫ বছর বয়সী। অন্য একটি সূত্রে অবশ্য দল অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনাও জানা গেল।
উরুগুয়ে দলেও কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত। দুই হলুদ কার্ডের খাঁড়ায় পড়ে খেলতে পারছেন না ডিফেন্ডার সেবাস্তিয়ান কোয়াতেস। হাঁটুর চোটের কারণে না-ও খেলতে পারেন গত মৌসুমে নাপোলির হয়ে দুর্দান্ত খেলা স্ট্রাইকার এডিনসন কাভানি। শেষ পর্যন্ত দল যা-ই হোক, মেসি-ফোরলান দ্বৈরথের ফলাফলই হয়তো গড়ে দেবে ম্যাচের ভাগ্য। এএফপি, রয়টার্স, ওয়েবসাইট।
মেসি, না ফোরলান?
ঘুম ভাঙল আর্জেন্টিনার
মুখে কদিনের না কামানো খোঁচা খোঁচা দাড়ি। এলোমেলো চুল। রুক্ষু চেহারা। লিওনেল মেসিকে দেখে মনে হচ্ছিল, রাতে ঠিকমতো ঘুম হয়নি। তবে এবার নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারেন, আসল মেসি আর আসল আর্জেন্টিনা যে জেগে উঠল। জেগে উঠল একেবারেই আসল সময়ে, যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল তাদের।
কাল সুন্দর ফুটবলের পসরা সাজিয়ে কোস্টারিকাকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিল আগের দুই ম্যাচে কপালগুণে ড্র করা আর্জেন্টিনা। এই জয় সংশয়ের সব মেঘ তাড়িয়ে দিয়ে নিশ্চিত করল তাদের কোয়ার্টার ফাইনাল। সবচেয়ে বড় কথা, জয়ের নায়ক মেসি এই বলে আশ্বস্ত করছেন, ‘এখন থেকে নতুন কোপা আমেরিকা শুরু হলো। এর আগে যা হয়েছে, সব অতীত।’
প্রথমার্ধের শেষ বাঁশি বাজার আগমুহূর্তে প্রথম গোল এনে দিয়েছেন সার্জিও আগুয়েরো। ৫২ মিনিটে দ্বিতীয় গোলটিও ম্যারাডোনার জামাইয়ের। সবচেয়ে সুন্দর গোল হয়েছে ৬৩ মিনিটে। ছবির মতো সাজানো আক্রমণ থেকে মেসির আলতো বাড়িয়ে দেওয়া বলে বাঁ পায়ের গোলায় ব্যবধান বাড়িয়েছেন অ্যাঙ্গেল ডি মারিয়া।
গোলদাতার তালিকায় নাম না থেকেও নায়ক মেসিই। দুটি গোলই বানিয়ে দিয়েছেন তিনি। সব মিলে কাল কোস্টারিকার গোলে ১৭টি শট নিয়েছে আর্জেন্টিনা। এর ৮টিই ছিল লক্ষ্যে। গোল হতে পারত আরও দুটি, একটি ক্রসবারে লেগে ফিরে এসেছে, অন্যটি লেগেছে ডান পোস্টে। আক্রমণের এই অর্কেস্ট্রায় মেসি ছিলেন কনডাক্টরের ভূমিকায়। দুটি গোলই তাঁর বানিয়ে দেওয়া। ভূমিকা আছে প্রথম গোলটিতেও।
প্রথম ম্যাচে ব্যর্থতার পরই বলা হচ্ছিল, জাভি-ইনিয়েস্তার ভূমিকাটা আসলে মেসিকেই নিতে হবে। তাহলেই বার্সেলোনার মতো খেলতে পারবে আর্জেন্টিনা। কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচেও নিজের একাদশে অটল থাকেন বাতিস্তা। শেষ পর্যন্ত ড্র করলেও বাদ পড়ার শঙ্কায় ভুগতে থাকা আর্জেন্টিনা কোচ সাহসী হলেন। গড়লেন আক্রমণাত্মক একাদশ।
এজেকুয়েল লাভেজ্জি, এভার বানেগা, এস্তেবান ক্যাম্বিয়াসোদের রাখা হলো একাদশের বাইরে। আক্রমণভাগে জুটি বাঁধলেন আগুয়েরো ও গঞ্জালো হিগুয়েইন। বাঁ প্রান্তে থাকলেন অ্যাঙ্গেল ডি মারিয়া। একটু নিচে নেমে মেসি। তাঁকে বল জোগানের কাজটা করে গেলেন ফার্নান্দো গ্যাগো আর হাভিয়ের মাচেরানো। এই ইতিবাচক পরিবর্তনের ফলও হাতেনাতে পেয়েছেন কোচ। পুরো ম্যাচে শুধু দুটি আক্ষেপ থাকতে পারে আর্জেন্টিনার—সুযোগ পেয়েও হ্যাটট্রিকটা করতে পারেননি আগুয়েরো আর গোলের দেখা পেতে পেতেও পাননি মেসি।
প্রথম গোলের দেখা পেতে অবশ্য অনেক অপেক্ষা করতে হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছিল বাতিস্তার টেনশন। অবশেষে প্রথমার্ধের শেষ বাঁশি বাজার একদম আগমুহূর্তে গোলরক্ষকের হাত থেকে ছুটে আসা বল জালে পাঠিয়ে দেন আগুয়েরো। এই গোলটাই যেন দ্বিতীয়ার্ধে ক্ষুধা বাড়িয়ে দিয়েছিল আর্জেন্টিনার। মুহুর্মুহু আক্রমণে কোস্টারিকাকে অস্থির করে তুলেছিলেন হিগুয়েইন-আগুয়েরো। পেছন থেকে একের পর এক বিপজ্জনক বল বাড়িয়ে দিচ্ছিলেন মেসি। ১১ মিনিটের ব্যবধানে আগুয়েরো আর ডি মারিয়ার দুটি গোল কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে দেয় আর্জেন্টিনার।
আগের দিন দুয়ো দেওয়া দর্শক এদিন তুমুল করতালির বৃষ্টিতে ভিজিয়েছে মেসিদের। তবে সবচেয়ে বড় স্যালুটটা আর্জেন্টিনা পেয়েছে প্রতিপক্ষ কোচ রিকার্ডো লা ভলপের কাছ থেকে, ‘আমরা ওদের গায়ে আঁচড়টাও দিতে পারিনি। আমরা তো বলই পেলাম না। মাঝবিরতিতে আমার খেলোয়াড়দের বলছিলাম, ছেলেরা, বলের দখল না রাখতে পারলে আমরা কিন্তু শেষ।’ আর্জেন্টিনার পাসিং ফুটবলে মুগ্ধ লা ভলপের মনে হয়েছে, ‘এটা ছিল অনেকটা পিংপং (টেবিল টেনিস) খেলার মতো।’
১৬ জুলাইয়ের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ হবে ‘সি’ গ্রুপের দ্বিতীয় সেরা দল। সেটি চিলি, পেরু কিংবা হতে পারে উরুগুয়ে। এএফপি, রয়টার্স।
‘ম্যারাডোনার সঙ্গে মেসির তুলনার সময় আসেনি’
লিওনেল মেসিকে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ‘প্রতিভাবান’ খেলোয়াড় হিসেবে স্বীকৃতি দিতে কোনো কুণ্ঠা নেই বেবেতোর। তবে ১৯৯৪ সালে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম নায়ক মনে করেন, ‘মেসি যদি সত্যিকারের গ্রেট হতে চান, তাহলে তাকে আর্জেন্টিনাকে সাফল্য এনে দিতে হবে।’
দীর্ঘদিন ধরেই ফুটবল বিশ্বের অন্যতম রহস্য হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে, আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে মেসির নিষ্প্রভতা। বার্সার জার্সি গায়ে চাপিয়ে মেসি যে ধরনের জাদুকরি পারফরম্যান্সে সকলকে তাক লাগিয়ে দেন, সেটা যেন অনেকটাই অনুপস্থিত থাকে জাতীয় দলের হয়ে খেলতে নেমে। এটিই এ মুহূর্তে মেসির সবচেয়ে বড় সমালোচনা হয়ে রয়েছে। নিন্দুকেরা তো বলেই ফেলেছেন, বার্সেলোনার হয়ে খেলতে নেমে মেসি সহযোগী হিসেবে পান জাভি, ইনিয়েস্তার মতো বল প্লেয়ারদের—তাঁদের সহযোগিতায় দুর্দান্ত হয় তাঁর পারফরম্যান্স। জাতীয় দলেতো মেসি আর এদের পান না, তাই তখন আর তাঁকে মাঠে খুঁজে পাওয়া যায় না।
মেসিকে নিয়ে এসব কথাবার্তা ভালো লাগছে না বেবেতোর। তিনি তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল হয়েই বলেছেন, ‘মেসিকে বুঝতে হবে আর্জেন্টিনা আর বার্সেলোনা এক নয়। গ্রেট খেলোয়াড় হতে হলে তাঁকে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে আরও অনেক ভালো খেলতে হবে, দলকে আরও অনেক সাফল্য এনে দিতে হবে।’
বেবেতোর মুখেও জাভি, ইনিয়েস্তার কথা উঠে এসেছে। তবে তা দিয়ে তিনি মেসির প্রতিভাকে ঢেকে দিতে চাননি। তিনি বলেছেন, ‘এটা স্বাভাবিক যে একসঙ্গে অনেক দিন ধরে খেললে খেলোয়াড়দের মধ্যে একধরনের সমঝোতা গড়ে ওঠে। তারা একে অন্যকে অনেক ভালো বুঝতে পারে। মেসির ক্ষেত্রেও এমনটাই হয়েছে। বার্সেলোনাতে মেসি জাভি, ইনিয়েস্তাদের সঙ্গে চমৎকার বোঝাপড়া করে খেলতে পারে বলেই বার্সার জার্সি গায়ে তাঁকে উজ্জ্বল দেখায়।’
মেসিকে এখনই ম্যারাডোনার সঙ্গে তুলনা করতে রাজি নন বেবেতো। তিনি বলেন, ‘ম্যারাডোনার সঙ্গে মেসির তুলনা করার সময় এখনো আসেনি। মেসিকে আরও অনেক দূর যেতে হবে।’
বেবেতোর মতে, ‘ম্যারাডোনা ছিলেন অন্য গ্রহের একজন খেলোয়াড়। তাঁর মাঠে বিচরণ ছিল রাজকীয়। ২২ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে ম্যারাডোনা আলাদাভাবে সব সময় চোখে পড়তেন। তিনি ছিলেন সত্যিকারের একজন গ্রেট ফুটবলার।’ ওয়েবসাইট।
